Pitara logo

নরহরি দাস

যেখানে মাঠের পাশে বন আছে, আর বনের ধারে মস্ত পাহাড় আছে, সেইখানে, একটা গর্তের ভিতরে একটি ছাগলছানা থাকত। সে তখনো বড় হয়নি, তাই গর্তের বাইরে যেতে পেত না। বাইরে যেতে চাইলেই তার মা বলত, ‘যাসনে! ভালুক ধরবে, বাঘে নিয়ে যাবে, সিংহ খেয়ে ফেলবে!’ তা শুনে তার ভয় হত, আর সে চুপ করে গর্তের ভিতরে বসে থাকত। তারপর সে একটূ বড় হল, তার ভয়ও কমে গেল। তখন তার মা বাইরে চলে গেলেই সে গর্তের ভিতর থেকে উঁকি মেরে দেখত। শেষে একদিন একেবারে গর্তের বাইরে চলে এল।

সেইখানে এক মস্ত ষাঁড় ঘাস খাচ্ছিল। ছাগলছানা আর এত বড় জন্তু আগে কখনো দেখেনি। কিন্তু তার শিং দেখেই সে মনে করে নিল, ওটাও ছাগল, খুব ভালো জিনিস খেয়ে এত বড় হয়েছে। তাই সে ষাঁড়ের কাছে গিয়ে জিগগেস করলে, ‘হ্যাঁগা, তুমি কি খাও?’

ষাঁড় বললে, ‘আমি ঘাস খাই।’

ছাগলছানা বললে, ‘ঘাস তো আমার মাও খায়, সে তো তোমার মতো এত বড় হয়নি।’

ষাঁড় বললে, ‘আমি তোমার মায়ের চেয়ে ঢের ভালো ঘাস অনেক বেশি করে খাই।’

ছাগলছানা বললে, ‘সে ঘাস কোথায়?’

ষাঁড় বললে, ‘ঐ বনের ভিতরে।’

ছাগলছানা বললে, ‘আমাকে সেখানে নিয়ে যেতে হবে।’ একথা শুনে ষাঁড় তাকে নিয়ে গেল।

সেই বনের ভিতেরে খুব চমৎকার ঘাস ছিল। ছাগলছানা পেটে যত ঘাস ধরল, সে তত ঘাস খেল।

খেয়ে তার পেট এমনি ভারি হল যে, সে আর চলতে পারে না।

সন্ধ্যে হলে ষাঁড় বললে, ‘এখন চল বাড়ি যাই।’

কিন্তু ছাগলছানা কি করে বাড়ি যাবে? সে চলতেই পারে না।

তাই সে বললে, ‘তুমি যাও, আমি কাল যাব।’

তখন ষাঁড় চলে গেল। ছাগলছানা একটা গর্ত দেখতে পেয়ে তার ভিতরে ঢুকে রইল।

সেই গর্তটা ছিল এক শিয়ালের। সে তার মামা বাঘের বাড়ি নিমন্ত্রণ খেতে গিয়েছিল। অনেক রাত্রে ফিরে এসে দেখে, তার গর্তের ভিতর একটা জন্তু ঢুকে রয়েছে। ছাগলছানাটা কালো ছিল, তাই শিয়াল অন্ধকারের ভিতর ভলো করে দেখতে পেল না। সে ভাবল বুঝি রাক্ষস-টাক্ষস হবে। তাই মনে করে সে ভয়ে-ভয়ে জিগগেস করল, ‘গর্তের ভিতরে কে ও?’

ছাগলছানাটা ভারি বুদ্ধিমান ছিল, সে বললে—

লম্বা লম্বা দাড়ি ঘন ঘন নাড়ি। সিংহের মামা আমি নরহরি দাস। পঞ্চাশ বাঘ মোর এক-এক গ্রাস। শুনেই তো শিয়াল, ‘বাবা গো।’ বলেই সেখান থেকে দে ছুট! এমনি ছুট দিল যে একেবারে বাঘের ওখানে গিয়ে তবে সে নিশ্বাস ফেললে।

বাঘ তকে দেখে আশ্চর্য হয়ে জিগগেস করলে, ‘কি ভাগ্নে, এই গেলে, আবার এখুনি এত ব্যস্ত হয়ে ফিরলে যে?’

শিয়াল হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, ‘মামা সর্বনাশ হয়েছে, আমার গর্তে এক নরহরি দাস এসেছে। সে বলে কিনা পঞ্চাশ বাঘে তার এক গ্রাস!’

তা শুনে বাঘ ভয়ানকে রেগে বললে, ‘বটে, তার এত বড় আস্পর্ধা! চল তো ভাগ্নে! তাকে দেখাব কেমন পঞ্চাশ বাঘে তার গ্রাস!’

শিযাল বললে, ‘আমি আর সেখানে যাব না, আমি সেখানে গেলে যদি সেটা হাঁ করে আমাদের খেতে আসে, তাহলে তুমি তো দুই লাফেই পালাবে। আমি তো তেমন ছুটতে পারবে না, আর সে বেটা আমাকেই ধরে খাবে।’

বাঘ বললে, ‘তাও কি হয়? আমি কখনো তোমাকে ফেলে পালাবো না।’

শিয়াল বললে, ‘তবে আমাকে তোমার লেজের সঙ্গে বেঁধে নিয়ে চল।’

তখন বাঘ তো শিয়ালকে বেশ করে লেজের সঙ্গে বেঁধে নিয়েছে, আর শিয়াল ভাবছে, ‘এবারে আর বাঘমামা আমাকে ফেলে পালাতে পারবে না।’

এমনি করে তারা দুজনে শিয়ালের গর্তের কাছে এল। ছাগলছানা দূর থেকেই তাদের দেখতে পেয়ে শিয়ালকে বললে—

দূর হতভাগা! তোকে দিলুম দশ ভাগের কড়ি, এক বাঘ নিয়ে এলি লেজে দিয়ে দড়ি! শুনেই তো বাঘের প্রাণ উড়ে গিয়েছে। সে ভাবলে যে, নিশ্চয় শিয়াল তাকে ফাঁকি দিয়ে নরহরি দাসকে খেতে দেবার জন্য এনেছে। তারপর সে কি আর সেখানে দাঁড়ায়? সে পঁচিশ হাত লম্বা এক-এক লাফ দিয়ে শিয়ালকে শুদ্ধ নিয়ে পালাল। শিয়াল বেচারা মাটিতে আছাড় খেয়ে, কাঁটার আঁচড় খেয়ে, খেতের আলে ঠোক্কর খেয়ে একেবারে যায় আর কি! শিয়াল চেচিঁয়ে বললে, ‘মামা, আল! মামা, আল!’ তা শুনে বাঘ ভবে বুঝি সেই নরহরি দাস এল তাই সে আরো বেশি করে ছোটে। এমনি করে সারারাত ছোটাছুটি করে সারা হল।

সকালে ছাগলছানা বাড়ি ফিরে এল।

শিয়ালের সেদিন ভারি সাজা হয়েছিল। সেই থেকে বাঘের উপর তার এমন রাগ হল যে, সে রাগ আর কিছুতেই গেল না।

বোকা জোলা আর শিয়ালের কথা