Pitara logo

কলাবতী রাজকন্যা - (১৩) - (১৪)

(১৩)

রহিলেন- ময়ূরপঙ্খী আসিয়া ঘাটে লাগিল, আর রাজ্যময় সাজ সাজ পড়িয়া গেল। রাজা আসিলেন, রাণীরা আসিলেন, রাজ্যের সকলে নদীর ধারে আসিল। মেঘ-বরণ চুল কুচ- বরণ কন্যা লইয়া রাজপুত্রেরা আসিয়াছেন।

রাণীরা ধান-দূর্বা দিয়া, পঞ্চদীপ সাজাইয়া, শাঁখ শঙ্খ বাজাইয়া কলাবতী রাজকন্যাকে বরণ করিয়া ঘরে তুলিলেন।

রাণীরা বলেলেন—“রাজকন্যা, তুমি কার?” রাজকন্যা বলিলেন— “ঢােল- ডগর যা’র।”
“ঢােল- ডগর হীরারাজপুত্রের?”
“না।” “ঢােল-ডগর মাণিকরাজপুত্রের?”
“না।” “ঢােল-ডগর মােতিরাজপুত্রের?”
‘না’। “ঢােল-ডগর শঙ্খরাজপুত্রের?”
“না।” “ঢােল ডগর কাঞ্চনরাজপুত্রের?”
“না।”

রাণীরা বলিলেন, “তবে তােমাকে কাটিয়া ফেলিব।”
রাজকন্যা বলিলেন, “আমার একমাস ব্রত, একমাস পরে যাহা ইচ্ছা করিও।”

তাহাই ঠিক হইল।

(১৪)

ভূতুমের মা, বুদ্ধুুুর মা, এতদিন কাঁদিয়া- কাঁদিয়া মর মর। শেষে দুইজনে নদীর জলে ডুবিয়া মরিতে গেলেন।

এমন সময় একদিক হইতে বুদ্ধুুু ডাকিল, “মা!”

আর একদিক হইতে ভূতুম ডাকিল, –“মা!” দীন- দুঃখিনী দুই মায়ে ফিরিয়া চাহিয়া দেখেন, –

বুকের ধন হারামণি বুদ্ধুুু আসিয়াছে!
বুকের ধন হারামণি ভূতুম আসিয়াছে!

বুদ্ধুুুর মা, ভূতুমের মা, পাগলের মত হইয়া ছুটিয়া গিয়া দুইজনে দুইজনকে বুকে নিলেন। বুদ্ধুু ভূতুমের চোখের জলে, তাঁহাদের চোখের জলে, পৃথিবী ভাসিয়া গেল। বুদ্ধুুু ভূতুম কুঁড়েয় গেল।

পরদিন, সেই যে ঢােল-ডগর ছিল? চিড়িয়াখানার বাঁদী, ঘুঁটে-কুড়ানী দাসীর কুঁড়ের কাছে, মস্ত হাট বাজার বসিয়া গিয়াছে। দেখিয়া লােক অবাক হইয়া গেল।

তাহার পরদিন, চিড়িয়াখানার বাঁদী, ঘুঁটে-কুড়ানী দাসীর কুঁড়ের চারিদিকে গাছের পাতায় পাতায় ফল ধরিয়াছে! দেখিয়া লােকেরা আশ্চর্যান্বিত হইয়া গেল। তাহার পরদিন, চিড়িয়াখানার বাঁদী, ঘুঁটে কুড়ানী দাসীর কুঁড়ে ঘিরিয়া লক্ষ সিপাই পাহারা দিতেছে! দেখিয়া লােক সকল চমকিয়া গেল। সেই খবর যে, রাজার কাছে গেল।

যাইতেই, সেইদিন কলাবতী রাজকন্যা বলিলেন, “মহারাজ, আমার ব্রতের দিন শেষ হইয়াছে; আমাকে মারিবেন, কি, কাটিবেন, কাটুন।” শুনিয়া রাজার চোখ ফুটিল- রাজা সব বুঝিতে পারিলেন। বুঝিয়া রাজা বলিলেন, “মা, আমি সব বুঝিয়াছি। কে আমার আছ, ন-রাণীকে আর ছােটরাণীকে ঢােল-ডগর বাজাইয়া ঘরে আন।”

অমনি রাজপুরীর যত ঢাক ঢােল বাজিয়া উঠিল। কলাবতী রাজকন্যা, নূতন- জলে স্নান, নূতন কাপড়ে পরণ, ব্রতের ধান-দূর্বা মাথায় গুজিয়া, দুই রাণীকে বরণ করিয়া আনিতে আপনি গেলেন।

শুনিয়া, পাঁচ রাণী ঘরে গিয়া খিল দিলেন। পাঁচ রাজপুত্র ঘরে গিয়া কবাট দিলেন।

লক্ষ সিপাই লইয়া, ঢােল-ডগর বাজাইয়া ন-রাণী ছােটরাণীকে নিয়া কলাবতী রাজকন্যা রাজপুরীতে ফিরিয়া আসিলেন। বুদ্ধুু ভূতুম আসিয়া রাজাকে প্রণাম করিল।

পরদিন মহা ধূম- ধামে মেঘ-বরণ চুল কুঁচবরণ কলাবতী রাজকন্যার সঙ্গে বুদ্ধুুুর বিবাহ হইল। আর-একদেশের রাজকন্যা। হীরাবতীর সঙ্গে ভূতুমের বিবাহ হইল।

পাঁচ রাণীরা আর খিল খুলিলেন না! পাঁচ রাজপুত্রেরা আর কবাট খুলিলেন না ! রাজা পাঁচ রাণীর আর পাঁচ রাজপুত্রের ঘরের উপরে কাঁটা দিয়া, মাটি দিয়া, বুজাইয়া দিলেন। ক’দিন যায়। একদিন রাত্রে, বুদ্ধুুুর ঘরে বুদ্বু, ভূতুমের ঘরে ভূতুম, কলাবতী রাজকন্যা হীরাবতী রাজকন্যা ঘুমে। খুব রাত্রে হীরাবতী কলাবতী উঠিয়া দেখেন, একি! হীরাবতীর ঘরে তাে সােয়ামী নাই! কলাবতীর ঘরেও তাে সােয়ামী নাই!- কি হইল, কি হইল? দেখেন, – বিছানার উপরে এক বানরের ছাল, বিছানার উপরে এক পেঁচার পাখ!! “অ্যাঁ- দ্যাখ!- তবে তাে এঁরা সত্যিকার বানর না, সত্যিকার পেঁচা ।”- দুই বােনে ভাবেন।- নানান খানান ভাবিয়া শেষে উঁকি দিয়া দেখেন- দুই রাজপুত্র ঘােড়ায় চাপিয়া রাজপুরী পাহারা দেয়। রাজপুত্রেরা যে দেবতার পুত্রের মত সুন্দর!

তখন, দুই বােনে যুক্তি করিয়া তাড়াতাড়ি পেঁচার পাখ বানরের ছাল প্রদীপের আগুনে পােড়াইয়া ফেলিলেন। পােড়াতেই, গন্ধ! গন্ধ পাইয়া দুই রাজপুত্র ঘােড়া ফেলিয়া ছুটিয়া আসিলেন। ছুটিয়া আসিয়া দেবকুমার দুই রাজপুত্র বলেন, “সর্বনাশ, সর্বনাশ! এ কি করিলে! সন্ন্যাসীর মন্ত্র ছিল, ছদ্মবেশে থাকিতাম, দেবপুরে যাইতাম আসিতাম, রাজপুরে পাহারা দিতাম, আর তাে সে সব করিতে। পারিব না!- এখন, আর তাে আমরা বানর পেঁচা হইয়া থাকিতে পারিব না! কথা যে, প্রকাশ হইল!”

দুই রাজকন্যা ছিলেন থতমত, হাসিয়া বলিলেন, “তা’র আর কি? তবে তাে ভালােই, তবে তাে বেশ হইল। ও মা। তবে নাকি পেঁচা?—তবে নাকি বানর?—আমরা কোথায় যাই!”

সােনার চাঁদ রাজপুত্র রাজার দুই পাশে দুই রাজকন্যার ঘরে, আর কি? সুখের নিশি, সুখের হাট। তার পরদিন ভােরে উঠিয়া সকলে দেখে, দেবতার মত মূর্তি দুই সােনার চাঁদ রাজপুত্র রাজার দুই পাশে বসিয়া আছে! দেখিয়া সকল লােকে চমৎকার মানিল।

কলাবতী রাজকন্যা বলিলেন, “উনি বানরের ছাল গায়ে দিয়া থাকিতেন; কাল রাত্রে আমি তাহা পােড়াইয়া ফেলিয়াছি।”

আর-একদেশের রাজকন্যা হীরাবতী বলিলেন, “উনি পেঁচার পাখ গায়ে দিয়া থাকিতেন, কাল আমি তাহা পােড়াইয়া ফেলিয়াছি।”

শুনিয়া সকলে ধন্য ধন্য করিল। তারপর?—তা’রপর—

বুদ্ধুুুর নাম হইয়াছে—বুধকুমার,
ভূতুমের নাম হইয়াছে—রূপকুমার। রাজ্যে আনন্দের জয়-জয়কার পড়িয়া গেল।

তাহার পর, ন-রাণী, ছােটরাণী, বুধকুমার, রূপকুমার আর কলাবতী রাজকন্যা, হীরাবতী রাজকন্যা, লইয়া, রাজা সুখে দিন কাটাইতে লাগিলেন।