Pitara logo

কলাবতী রাজকন্যা - (১২)

(১২)

যাইতে যাইতে বুদ্ধুুু পাতাল-পুরীতে গিয়া দেখিল, এক মস্ত সুড়ঙ্গ। বুদ্ধুুু সুড়ঙ্গ দিয়া, নামিল।

সুড়ঙ্গ পার হইয়া বুদ্ধুুু দেখিল, এক যে-রাজপুরী! যেন ইন্দ্রপুরীর মত!!! কিন্তু সে রাজ্যে মানুষ নাই, জন নাই, কেবল এক একশ বছরে’র বুড়ী বসিয়া একটি ছােট কাঁথা সেলাই করিতেছে। বুড়ী বুদ্ধুুুকে দেখিয়াই হাতের কাঁথা বুদ্র গায়ে ছুঁড়িয়া মারিল। অমনি হাজার হাজার সিপাই আসিয়া বুদ্ধুুুকে বাঁধিয়া-ছাঁদিয়া রাজপুরীর মধ্যে লইয়া গেল।

নিয়া গিয়া, সিপাইরা, এক অন্ধকুঠরীর মধ্যে, বুদ্ধুুুকে বন্ধ করিয়া রাখিয়া দিল। অমনি কুঠরীর মধ্যে- “বুদ্ধুু ভাই, বুদ্ধুুু ভাই, আয় ভাই, আয় ভাই।” বলিয়া অনেক লােক বুদ্ধুুুকে ঘিরিয়া ধরিল। বুদ্ধুুু দেখিল, রাজপুত্র আর মাল্লা-মাঝিরা!

বুদ্ধুুু বলিল, “বটে! তা, আচ্ছা!”

পরদিন বুদ্ধুু দাঁত মুখ সিটকাইয়া মরিয়া রহিল! এক দাসী রাজপুত্রদিগে নিত্য কি-না খাবার দিয়া যাইত! সে আসিয়া দেখে, কুঠরীর মধ্যে একটা বানর মরিয়া পড়িয়া আছে। সে যাইবার সময় মরা বানরটাকে ফেলিয়া দিয়া গেল। আর কি?- তখন বুদ্ধুুু আস্তে আস্তে চোখ মিটি মিটি করিয়া উঠে। না, তাে, এদিক ওদিক চাহিয়া। বুদ্ধুু, উঠিল। উঠিয়াই বুদ্ধুু দেখিল প্রকাণ্ড রাজপুরীর তে-তলায় মেঘ বরণ চুল কুঁচবরণ কন্যা সােনার শুকের সঙ্গে কথা কহিতেছে। বুদ্ধুুু গাছের ডালে ডালে, দালানের ছাদে ছাদে গিয়া, কুচ-বরণ কন্যার পিছনে দাঁড়াইল। তখন কুঁচবরণ কন্যা বলিতেছিলেন, –

“সােনার পাখী, ও রে শুক, মিছাই গেল
রূপার বৈঠা হীরার হাল—কেউ না এল!”

রাজকন্যার খোঁপায় মােতির ফুল ছিল, বুদ্ধুুু আস্তে- মােতির ফুলটি উঠাইয়া লইল।

তখন শুক বলিল,

“কুঁচবরণ কন্যা মেঘ-বরণ চুল,
কি হইল কন্যা, মােতির ফুল?”

রাজকন্যা খোঁপায় হাত দিয়া দেখিলেন, ফুল নাই।

শুক বলিল, –

“কলাবতী রাজকন্যা, চিন্তা কি আর,
মাথা তুলে’ চেয়ে দেখ, বর তােমার!”

কলাবতী, চমকিয়া পিছন ফিরিয়া দেখেন, বানর! কলাবতীর মাথা হেঁট হইল। হাতের কাঁকণ ছুঁড়িয়া ফেলিয়া মেঘ-বরণ চুলের। বেণী এলাইয়া দিয়া, কলাবতী রাজকন্যা মাটিতে লুটাইয়া পড়িলেন।

কিন্তু, রাজকন্যা কি করিবেন? যখন পণ করিয়াছিলেন, যে, তিন বুড়ীর রাজ্য পার হইয়া, রাঙ্গা- নদীর জল পাড়ি দিয়া, কাঁথা-বুড়ীর, আর, অন্ধকুঠরীর হাত এড়াইয়া তাঁহার পুরীতে আসিয়া যে মােতির ফুল নিতে পারিবে, সে-ই তাঁহার স্বামী হইবে। তখন রাজকন্য আর কি করেন?- উঠিয়া বানরের গলায় মালা দিলেন।

তখন বুদ্ধুুু হাসিয়া বলিল, “রাজকন্যা, এখন তুমি কার?”

রাজকন্যা বলিলেন, “আগে ছিলাম বাপের- মায়ের, তার পরে ছিলাম আমার; এখন তােমার।”

বুদ্ধুুু বলিল, “তবে আমার দাদাদিগে ছাড়িয়া দাও, আর তুমি আমার সঙ্গে আমার বাড়ীতে চল। মা’দের বড় কষ্ট, তুমি গেলে তাঁহাদের কষ্ট থাকিবে না।”

রাজকন্যা বলিলেন, “এখন তুমি যাহা বলিবে, তাহাই করিব। তা চল; কিন্তু তুমি আমাকে এমনি নিতে পারিবে না, আমি এই কৌটার মধ্যে থাকি, তুমি কৌটায় করিয়া আমাকে লইয়া চল।”

বুদ্ধুুু বলিল, “আচ্ছা।” রাজকন্যা কৌটার ভিতর উঠিলেন। অমনি শুকপাখী তাড়াতাড়ি গিয়া ঢােল-ডগরে ঘা দিল। দেখিতে দেখিতে রাজপুরীর মধ্যে এক প্রকাণ্ড হাট-বাজার বসিয়া গেল। রাজকন্যার কৌটা দোকানীর কৌটার সঙ্গে মিশিয়া গেল।

বুদ্ধুু দেখিল, এ তাে বেশ সে ঢােল-ডগর লইয়া বাজাইতে আরম্ভ করিয়া দিল। ঢােল- ডগরের ডাহিনে ঘা দিলে হাট-বাজার বসে, বাঁয়ে ঘা দিলে হাট-বাজার ভাঙ্গিয়া যায়। বুদ্ধুুু চোখ বুজিয়া বসিয়া বসিয়া বাজাইতে লাগিল। দোকানীরা দোকান উঠাইতে- নামাইতে উঠাইতে- নামাইতে একেবারে হয়রাণ হইয়া গেল, আর পারে না। তখন সকলে বলিল, “রাখুন, রাখুন, রাজকন্যার কৌটা নেন; আমরা আর হাট করিতে চাহি না।”

বুদ্ধুুু ঢােল- ডগরের বাঁয়ে ঘা মারিল, হাট ভাঙ্গিয়া গেল। কেবল রাজকন্যার কৌটাটি পড়িয়া রহিল।

বুদ্ধুু এবার আর কিন্তু ঢােলটি ছাড়িল না। ঢােলটি কাঁধে করিয়া কৌটার কাছে গিয়া ডাকিল, –

“রাজকন্যা রাজকন্যা, ঘুমে আছ কি? বরে’ নিতে ঢােল-ডগর নিয়ে এসেছি।”

রাজকন্যা কৌটা হইতে বাহির হইয়া বলিলেন- “আমার বড় ক্ষুধা পাইয়াছে, গাছের পাতার ফল আনিয়া দাও, খাইব।”

বুদ্ধুু বলিল, “আচ্ছা।” রাজকন্যা কৌটায় উঠিলেন। বুদ্ধুু ঢােল কাঁধে কৌটা হাতে গাছের পাতার- ফল আনিতে চলিল।

সেখানে গিয়া বুদ্ধুু দেখিল, গাছের পাতায় পাতায় কত রকম ফল ধরিয়া রহিয়াছে। দেখিয়া বুদ্ধুুরও লােভ হইল ! কিন্তু, ও বাবা। এক যে অজগর—গাছের গােড়ায় সোঁ সোঁ করিয়া ফোঁসাইতেছে! গাছের পাতার ফল।

বুদ্ধুুু তখন আস্তে আস্তে গাছের চারিদিকে ঘুরিয়া আসিয়া এক দৌড় দিল। তাহার কোমরের সূতায় জড়াইয়া, অজগর, কাটিয়া দুইখান হইয়া গেল। তখন বুদ্ধুু গাছে উঠিয়া, পাতার ফল পাড়িয়া রাজকন্যাকে ডাকিল।

রাজকন্যা বলিলেন, “আর না, সব হইয়াছে।… এখন চল, তােমার বাড়ী যাইব!”

বুদ্ধুু বলিল, “না, সব হয় নাই; রাজপুত্রদাদাদিগে আর বুড়ীর কাঁথাটি লইতে। হইবে।” রাজকন্যা বলিলেন, “লও।”

বুড়ীর কাঁথা গাযে বুদ্ধুু তখন পাঁচ রাজপুত্র, মাল্লা, মাঝি, ময়ূরপঙ্খী, স-ব লইয়া, ঢােল ডগর কাঁধে, কৌটা হাতে, মােতির ফুল কানে, বুড়ীর কাঁথা গায়ে বুদ্ধুু গাছের পাতার- ফল খাইতে খাইতে কোমরের সূতায় টান দিল। ভূতুম বুঝিল এইবার বুদ্ধুুু আসিতেছে। সে সূতা টানিয়া তুলিল। পাঁচ রাজপুত্র, সিপাই- লস্কর, মাল্লা-মাঝি, ময়ূরপঙ্খী, সব লইয়া বুদ্ধুুু। ভাসিয়া উঠিল।

ভাসিয়া উঠিয়া মাল্লা-মাঝিরা, সার সার’ করিয়া পাল তুলিয়া দিল। বুদ্ধুু গিয়া ময়ূরপঙ্খীর ছাদে বসিল, পেঁচা গিয়া ময়ূরপঙ্খীর মাস্তুলে বসিল।

এবার সকলকে লইয়া ময়ূরপঙ্খী দেশে চলিল।

ছাদের উপর বুদ্ধুুু চোখ মিটি মিটি করে আর মাঝে মাঝে কৌটা খুলিয়া কাহার সঙ্গে যেন কথা হয়, হা’লের মাঝি, যে, রাজপুত্রদিগে এই খবর দিল।

খবর পাইয়া তাহারা চুপ।…রাত্রে সকলে ঘুমাইয়াছে, ভূতুম আর বুদ্ধুুুও ঘুমাইতেছে; সেই সময়, রাজপুত্রেরা চুপি চুপি আসিয়া কৌটাটি সরাইয়া লইয়া, ঢােল-ডগর শিয়রে, বুড়ীর কাঁথা-গায়ে বুদ্বুকে ধাক্কা দিয়া জলে ফেলিয়া দিলেন। ভূতুম মাস্তুলে ছিল, তার বুকে তীর মারিলেন। বুদ্ধুু, ভূতুম, জলে পড়িয়া ভাসিয়া গেল।

তখন কৌটা খুলিতেই, মেঘ-বরণ চুল কুঁচ-বরণ রাজকন্যা বাহির হইলেন। রাজপুত্রেরা বলিলেন, “রাজকন্যা, এখন তুমি কা’র?” রাজকন্যা বলিলেন, “ঢােল-ডগর যা’র।”

শুনিয়া রাজপুত্রেরা বলিলেন, “ও! তা বুঝিয়াছি! - রাজকন্যাকে আটক কর।”

কি করিবেন? রাজকন্যা ময়ূরপঙ্খীর এক কুঠরীর মধ্যে আটক হইয়া রহিলেন।

কলাবতী রাজকন্যা - (১৩) - (১৪)