Pitara logo

কলাবতী রাজকন্যা - (১০) - (১১)

(১০)

আর, রাজপুত্রেরা? রাজপুত্রদের ময়ূরপঙ্খী যাইতে যাইতে তিন বুড়ীর রাজ্যে গিয়া পৌঁছিল। অমনি তিন বুড়ীর তিন বুড়া পাইক আসিয়া নৌকা আটকাইল। নৌকা আটকাইয়া তাহারা মাঝি-মাল্লা। সিপাই-লস্কর সব শুদ্ধ পাঁচ রাজপুত্রকে থলের মধ্যে পুরিয়া তিন বুড়ীর কাছে নিয়া গেল।

তাহাদিগে দিয়া তিন বুড়ী তিন সন্ধ্যা জল খাইয়া, নাক ডাকাইয়া ঘুমাইয়া পড়িল!

অনেক রাত্রে, তিন বুড়ীর পেটের মধ্য হইতে রাজপুত্রেরা বলাবলি করিতে লাগিল, – “ভাই, জন্মের মত বুড়ীদের পেটে রহিলাম। আর মা’দিগে দেখিব, আর বাবাকে দেখিব না।”

এমন সময় কাহারা আসিয়া আস্তে আস্তে ডাকিল, “দাদা! দাদা!”

রাজপুত্রেরা চুপি চুপি উত্তর করিল, “কে ভাই, কে ভাই? আমরা যে বুড়ীর পেটে!”

বাহির হইতে উত্তর হইল, –“আমার লেজ ধর”; “আমার পুচ্ছ ধর।” রাজপুত্রেরা লেজ ধরিয়া, পুচ্ছ ধরিয়া, বুড়ীদের নাকের ছিদ্র দিয়া বাহির হইয়া আসিল। আসিয়া দেখে; বুদ্ধুুু আর ভূতুম!

বুদ্ধুু বলিল, “চুপ, চুপ! শীল্পীর তরােয়াল দিয়ে বুড়ীদের গলা কাটিয়া ফেল।”

রাজপুত্রেরা তাহাই করিলেন। রাজপুত্র, মাল্লা-মাঝি সকলে বাহির হইয়া আসিল। আসিয়া, সকলে তাড়াতাড়ি ময়ূরপঙ্খীতে পাল তুলিয়া দিল। বুদ্ধুু আর ভূতুমকে কেহ জিজ্ঞাসাও করিল না।

(১১)

ময়ূরপঙ্খী সারারাত ছুটিয়া ছুটিয়া ভােরে রাঙ্গা নদীর জলে গিয়া পড়িল। রাঙ্গা নদীর চারিদিকে কূল নাই, কিনারা নাই, কেবল রাঙ্গা জল। মাঝিরা দিক হারাইল; পাঁচ ময়ূরপঙ্খী ঘুরিতে ঘুরিতে সমুদ্রে গিয়া পড়িল। রাজপুত্র মাল্লা-মাঝি সকলে হাহাকার করিয়া উঠিল। সাত দিন সাত রাত্রি ধরিয়া ময়ূরপঙ্খীগুলি সমুদ্রের মধ্যে আছাড়িপিছাড়ি করিল। শেষে, নৌকা আর থাকে না; সব যায়-যায়!

রাজপুত্রেরা বলিলেন, “হায় ভাই, বুদ্ধুুু ভাই থাকিলে আজি এখন রক্ষা করিত!” “হায় ভাই, ভূতুম ভাই থাকিলে এখন রক্ষা করিত!”

“কি ভাই, কি ভাই! কি চাই, কি চাই?” বলিয়া বুদ্ধুু আর ভূতুম তাহাদের সুপারীর ডােঙ্গা ময়ূরপঙ্খীর গলুইয়ের সঙ্গে বাঁধিয়া থুইয়া, রাজপুত্রদের কাছে আসিল। আর, মাঝিদিগে বলিল, “উত্তর দিকে পাল তুলিয়া দে।”

দেখিতে দেখিতে ময়ূরপঙ্খী সমুদ্র ছাড়াইয়া এক নদীতে আসিয়া পড়িল। নদীর জল যেন টলটল্ ছলছ করিতেছে। দুই পাড়ে আম-কাঁটালের হাজার গাছ। রাজপুত্রেরা সকলে পেট ভরিয়া আম, কাঁটাল খাইয়া, সুস্থির হইলেন।

তখন রাজপুত্রেরা বলিলেন, “ময়ুরপঙ্খীতে বানর আর পেঁচা কেন রে? এ দুইটাকে জলে ফেলিয়া দে।” মাঝিরা বুদ্ধুুু আর ভূতুমকে জলে ফেলিয়া দিল; তাহাদের সুপারীর ডােঙ্গা খুলিয়া ছুঁড়িয়া ফেলিল। নদীর জলে ময়ুরপঙ্খী আবার চলিতে লাগিল।

চলিতে চলিতে এক জায়গায় আসিয়া পাঁচটি ময়ূরপঙ্খীই রাজপুত্র, মাল্লা, মাঝি সব লইয়া, ভুস করিয়া ডুবিয়া গেল। আর তাহাদের কোনও চিহ্ন-ই রহিল না।

কতক্ষণ পর, বুদ্ধুু আর ভূতুমের ডােঙ্গা যে, সেইখানে আসিল। বুদ্ধুুু বলিল—“দাদা!” ভূতুম বলিল, “কি?”

বুদ্বু- “আমার মন যেন কেমন কেমন করে, এইখানে কি যেন হইয়াছে। এস তাে, ডুব দিয়া, দেখি।”

ভূতুম বলিল, “হ’ক গে! ওরা মরিয়া গেলেই বাঁচি। আমি ডুবটুব দিতে পারিব না।” বুদ্ধুুু বলিল, “ছি, ছি, অমন কথা বলিও না। তা, তুমি থাক; এই আমার কোমরে সূতা বাঁধিলাম, যতদিন সূতাতে টান না দিব, ততদিন যেন তুলিও না।”

ভূতুম বলিল, “আচ্ছা, তা’ পারি।” তখন বুদ্ধুুু নদীর জলে ডুব দিল; ভূতুম সূতা ধরিয়া বসিয়া রহিল।

কলাবতী রাজকন্যা - (১২)