Pitara logo

দুষ্মন্ত

যে-দেশে ঋষির তপােবন ছিল, সেই দেশের রাজার নাম ছিল— দুষ্মন্ত।

সেকালে এত বড় রাজা কেউ ছিল না। তিনি পুব-দেশের রাজা, পশ্চিম-দেশের রাজা, উত্তর-দেশের রাজা, দক্ষিণ-দেশের রাজা, সব রাজার রাজা ছিলেন। সাত-সমুদ্র-তের-নদী— সব তার রাজ্য। পৃথিবীর এক রাজা রাজা দুষ্মন্ত। তার কত সৈন্যসামন্ত ছিল, হাতিশালে কত হাতি ছিল, ঘােড়াশালে কত ঘােড়। ছিল, গাড়িখানায় কত সােনা রূপাের রথ ছিল, রাজমহলে কত দাস দাসী ছিল ; দেশ জুড়ে তার সুনাম ছিল, ক্রোশ জুড়ে সােনার রাজপুরী ছিল, আর ব্রাহ্মণকুমার মাধব্য সেই রাজার প্রিয় সখা ছিল। , যেদিন তপােবনে মল্লিকার ফুল ফুটল, সেই দিন সাত-সমুদ্র-তেরনদীর রাজা, রাজা দুষ্মন্ত, প্রিয়সখ। মাধব্যকে বললেন- ‘চল বন্ধু, আজ মৃগয়ায় যাই।

মৃগয়ার নামে মাধবব্যর যেন জ্বর এল। গরিব ব্রাহ্মণ রাজবাড়িতে রাজার হালে থাকে, দুবেলা থাল-থাল লুচি মণ্ডা, ভারভার ক্ষীর দই দিয়ে মােটা পেট ঠাণ্ডা রাখে, মৃগয়ার নামে বেচারার মুখ এতটুকু হয়ে গেল, বাঘ ভালুকের ভয়ে প্রাণ কেঁপে উঠল।

‘না’ বলবার যাে কী, রাজার আজ্ঞা!

অমনি হাতিশালে হাতি সাজল, ঘােড়াশালে ঘােড়া সাজল, কোমর বেঁধে পালােয়ান এল, বর্শা হাতে শিকারী এল, ধনুক হাতে ব্যাধ এল, জাল ঘাড়ে জেলে এল। তারপর সারথি রাজার সােনার রথ নিয়ে এল, সিংহদ্বারে সােনার কপাট ঝঙ্কনা দিয়ে খুলে গেল।

রাজা সােনার রথে শিকারে চললেন। দুপাশে দুই রাজহস্তী চামর দোলাতে ঢােলাতে চলল, ছত্রধর রাজছত্র ধরে চলল, জয়ঢাক বাজতে বাজতে চলল, আর সর্বশেষে প্রিয়সখা মাধব্য এক খোঁড়া ঘােড়ায় হইহট করে চললেন।

ক্রমে রাজা এ-বন সে-বন ঘুরে শেষে মহাবনে এসে পড়লেন। গাছে গাছে ব্যাধ ফঁদ পাততে লাগল, খালে বিলে জেলে জাল ফেলতে লাগল, সৈন্য সামন্ত বন ঘিরতে লাগল-বনে সাড়া পড়ে গেল।

গাছে গাছে কত পাখি, কত পাখির ছানা পাতার ফাকে ফাকে কচি পাতার মত ছােটো ডানা নাড়ছিল, রাঙা ফলের মতাে ডালে দুলছিল, আকাশে উড়ে যাচ্ছিল, কোটরে ফিরে আসছিল, কিচমিচ করছিল। ব্যাধের সাড়া পেয়ে, বাসা ফেলে, কোটর ছেড়ে, কে কোথায় পালাতে লাগল।

মােষ গরমের দিনে ভিজে কাদায় পড়ে ঠাণ্ডা হচ্ছিল, তাড়া পেয়ে শিং উচিয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে গহন বনে পালাতে লাগল। হাতি শুড়ে করে জল ছিটিয়ে গা ধুচ্ছিল, শালগাছে গা ঘষছিল, গাছের ডাল ঘুরিয়ে মশা তাড়াচ্ছিল, ভয় পেয়ে শুড় তুলে, পদ্মবন দলে, ব্যাধের জাল ছিড়ে পালাতে আরম্ভ করলে। বনে বাঘ হকার দিয়ে উঠল, পর্বতে সিংহ গর্জন করে উঠল, সারা বন কেঁপে উঠল।

কত পাখি, কত বরা, কত বাঘ, কত ভালুক, কেউ জালে ধরা পড়ল, কেউ ফাদে বাঁধা পড়ল, কেউ বা তলােয়ারে কাটা গেল; বনে হাহাকার পড়ে গেল। বনের বাঘ বন দিয়ে, জলের কুমির জল দিয়ে, আকাশের পাখি আকাশ ছেয়ে পালাতে আরম্ভ করলে।

ফঁাদ নিয়ে ব্যাধ পাখির সঙ্গে ছুটল, তীর নিয়ে বীর বাঘের সঙ্গে গেল, জাল ঘাড়ে জেলে মাছের সঙ্গে চলল, রাজা সােনার রথে এক হরিণের সঙ্গে ছুটলেন। হরিণ প্রাণভয়ে হাওয়ার মতাে রথের আগে দৌড়িয়েছে, সােনার রথ তার পিছনে বিদ্যুতের বেগে চলেছে। রাজার সৈন্য-সামন্ত, হাতি, ঘােড়, প্রিয়সখা মাধব্য, কতদূরে কোথায় পড়ে রইল। কেবল রাজার রথ আর বনের হরিণ নদীর ধার দিয়ে, বনের ভিতর দিয়ে, মাঠের উপর দিয়ে ছুটে চলল।

যখন গহন বনে এই শিকার চলছিল তখন সেই তপােবন সকলে নির্ভয়ে ছিল। গাছের ডালে টিয়াপাখি লাল ঠোটে ধান খুটছিল, নদীর জলে মনের সুখে হাঁস ভাসছিল, কুশবনে পােষা হরিণ নির্ভয়ে খেলা করছিল; আর শকুন্তলা, অনসূয়া, প্রিয়ম্বদা- তিন সখী কুঞ্জবনে গু-গুন্ গল্প করছিল।

এই তপােৰনে সকলে নির্ভয়, কেউ কারাে হিংসা করে না। মহাযােগ কথের পােবনে বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খায়। হরিণশিশু ও সিংহশাবক এক বনে খেলা করে। এ-বনে রাজাদেরও শিকার করা নিষেধ। রাজার শিকার সেই হরিণ— উধ্বশ্বাসে এই তপােবনের ভিতর চলে গেল। রাজাও অমনি ধনুঃশর ফেলে ঋষিদর্শনে চললেন।

সেই তপােবনে সােনার রথে পৃথিবীর রাজা, আর মাধবীকুঞ্জে রূপসী শকুন্তলা–দুজনে দেখা হল! এদিকে মাধব্য কী বিপদেই পড়েছে। আর সে পারে না! রাজভােগ না হলে তার চলে না, নরম বিছানা ছাড়া ঘুম হয় না, পালকি ছাড়া সে এক পা চলে না, তার কি সারাদিন ঘােড়ার পিঠে চড়ে ‘ওই বরা যায়, ওই বাঘ পালায়’ করে এ-বন সে-বন ঘুরে বেড়ানাে পােষায়? পম্বলের পাতা-পচা কষা জলে কি তার তৃষ্ণা ভাঙে? ঠিক সময় রাজভােগ না পেলে সে অন্ধকার দেখে, তার কি সারাদিনের পর একটু আধপােড়া মাংসে পেট ভরে? পাতার বিছানায় মশার কামড়ে তার কি ঘুম হয়! বনে এসে ব্রাহ্মণ মহা মুশকিলে পড়েছে! সমস্ত দিন ঘােড়ার পিঠে ফিরে সর্বাঙ্গে দারুণ ব্যথা, মশার জ্বালায় রাত্রে নিদ্রা নেই, মনে সর্বদা ভয়— ওই ভালুক এল, ওই বুঝি বাঘে ধরলে! ভয়ে ভয়ে বেচারা আধখানা হয়ে গেছে। রাজাকে কত বােঝাচ্ছে— “মহারাজ, রাজ্য ছারেখারে যায়, শরীর মাটি হল, আর কেন? রাজ্যে চলুন। রাজা তবু শুনলেন না, শকুন্তলাকে দেখে অবধি রাজকার্য ছেড়ে, মৃগয়া ছেড়ে, তপস্বীর মতাে সেই তপােবনে রইলেন। রাজ্যে রাজার মা ব্ৰত করছেন, রাজাকে ডেকে পাঠালেন, তবু রাজ্যে ফিরলেন না, কত ওজর-আপত্তি করে মাধব্যকে সব সৈন্যসামন্ত সঙ্গে মা-র কাছে পাঠিয়ে দিয়ে একলা সেই তপােবনে রইলেন।

মাধব্য রাজবাড়িতে মনের আনন্দে রাজার হালে আছে, আর এদিকে পৃথিবীর রাজা বনবাসীর মধ্যে বনে বনে ‘হা শকুন্তলা! হাে শকুন্তলা! বলে ফিরছে। হাতের ধনুক, তূণের বাণ কোন বনে পড়ে আছে! রাজবেশ নদীর জলে ভেসে গেছে, সােনার অঙ্গ কালি হয়েছে, দেশের রাজা বনে ফিরছে।

আর শকুন্তলা কী করছে?

নিকুঞ্জবনে পদ্মের বিছানায় বসে পদ্মপাতায় মহারাজাকে মনের কথা লিখছে। রাজাকে দেখে কে জানে তার মন কেমন হল! একদণ্ড না দেখলে প্রাণ কঁদে, চোখের জলে বুক ভেসে যায়। দুই সখী তাকে পদ্মফুলে বাতাস করছে, গলা ধরে কত আদর করছে, আঁচলে চোখ মােছাচ্ছে, আর ভাবছে— এইবার ভাের হল, বুঝি সখীর রাজা ফিরে এল।

তারপর কী হল?

দুঃখের নিশি প্রভাত হল, মাধবীর পাতায় পাতায় ফুল ফুটল, নিকুঞ্জের গাছে গাছে পাখি ডাকল, সখীদের পােষা হরিণ কাছে এল।

আর কী হল? বনপথে রাজা-বর কুঞ্জে এল। আর কী হল?

পৃথিবীর রাজা আর বনের শকুন্তলা— দুজনে মালা-বদল হল। দুই সখীর মনােবাঞ্ছা পূর্ণ হল।

তারপর কী হল?

তারপর কতদিন পরে সােনার সাঝে সােনার রথ রাজাকে নিয়ে রাজ্যে গেল, আর আঁধার বনপথে দুই প্রিয়সখী শকুন্তলাকে নিয়ে ঘরে গেল।

তপােবনে