Pitara logo

ক্ষীরের পুতুল - ষষ্ঠ অধ্যায়

মন্ত্রী রাজার হুকুম জারি করলেন। রাজার লােকজন দিঘির জলে নেয়ে, বেঁধে-বেড়ে খেয়ে, তাবুর ভিতর শুয়ে রইল, বটগাছের দিকে এল না। গাঁয়ের বৌ-ঝি ষষ্ঠীঠাকরুণের পুজো দিতে এল, রাজার পাহারা হাঁকিয়ে দিলে।

সেদিন বটতলায় ষষ্ঠীঠাকরুনের পুজো হল না। ষষ্ঠীঠাকরুন খিদের জ্বালায় অস্থির হলেন, তেষ্টায় গলা শুকিয়ে কাঠ হল। বানর মনে মনে হাসতে লাগল।

এমনি বেলা অনেক হল। ষষ্ঠীঠাকরুনের মুখে জলবিন্দু পড়ল না, ঠাকরুন কাঠামাের ভিতর ছটফট করতে লাগলেন, ঠাকরুনের কালাে বেড়াল মিউমিউ করে কাঁদতে লাগল। বানর তখন মনে-মনে ফন্দি এঁটে পালকির দরজা খুলে রেখে আড়ালে গেল।

ষষ্ঠীঠাকরুন ভাবলেন- আঃ অপদ গেল! কাঠফাটা রোদে কাঠামাে থেকে বার হয়ে নৈবেদ্যের ছােলাটা কলাটা সন্ধান করতে লাগলেন। খুঁজতে খুঁজতে দেখেন, পালকির ভিতর ক্ষীরের পুতুল। ঠাকরুন আর লোভ সামলাতে পারলেন না, মনে-মনে ঘুমপাড়ানি মাসি-পিসিকে স্মরণ করলেন।

দিগনগরে যখন দিন, ঘুমের দেশে তখন রাত। ঘুমপাড়ানি মাসি-পিসি সারারাত দিগনগরে ষষ্ঠীরদাস ষেঠের-বাছা ছেলেদের চোখে ঘুম দিয়ে, সকালবেলা ঘুমের দেশে রাজার মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে, অনেক বেলায় একটুখানি চোখ বুজেছেন, এমন সময় ষষ্ঠীঠাকরুনের ডাক পড়ল। ঘুমের দেশে ঘুমপাড়ানি মাসি জেগে উঠলেন, ঘুমপাড়ানি পিসি উঠে বসলেন, দুই বােনে ঘুমের দেশ ছেড়ে দিগনগরে এলেন। ষষ্ঠীর পায়ে প্রণাম করে বললেন— ঠাকরুন, দিনে-দুপুরে ডেকেছেন কেন?

ঠাকরুন বললেন— বাছারা, এতখানি বেলা হল এখনও ভােগ পাইনি। তোরা একটি কাজ কর, দেশের যে যেখানে আছে ঘুম পাড়িয়ে দে, আমি ডুলির ভিতর ক্ষীরের পুতুলটি খেয়ে আসি।

ষষ্ঠীঠাকরুনের কথায় মাসি-পিসি মায়া করলেন, দেশের লােক ঘুমিয়ে পড়ল। মাঠের মাঝে রাখাল, ঘরের মাঝে খোকা, খােকার পাশে খােকার মা, খেলাঘরে খােকার দিদি ঘুমিয়ে পড়ল। ষষ্ঠীতলায় রাজার লােকজন, পাঠশালায় গাঁয়ের ছেলেপিলে ঘুমিয়ে পড়ল। রাজার মন্ত্রী হুকোর নল মুখে ঘুমিয়ে পড়লেন, গায়ের গুরু বেত হাতে ঢুলে পড়লেন। দিগনগরে দিনে-দুপুরে রাত এল। মাসি-পিসি সবার চোখে ঘুম দিলেন– জেগে রইল গায়ের মাঝে রাস্তার শেয়াল-কুকুর, দিঘির ধারে রাজার হাতি-ঘােড়া, বনের মাঝে বনের পাখি, গাছের ডালে রানীর বানর। আর জেগে রইল, ষষ্ঠীরদাস বনের বেড়াল, জলের বেড়াল, গাছের বেড়াল, ঘরের বেড়াল। ষষ্ঠীঠাকরুন তখন ডুলি খুলে ক্ষীরের ছেলে হাতে নিলেন। ক্ষীরের গন্ধে গাছ থেকে কাঠবেড়াল নেমে এল, বন থেকে বনবেড়াল ছুটে এল, জল থেকে উদবেড়াল উঠে এল, কুনােবেড়াল কোণ ছেড়ে ষষ্ঠী তলায় চলে এল। ষষ্ঠীঠাকরুন ক্ষীরের ছেলের দশটি আঙুল বেড়ালদের খেতে দিলেন। নিজে ক্ষীরের হাত, ক্ষীরের পা, ক্ষারের বুক পিঠ মাথা খেয়ে, ক্ষীরের দুটি কান মাসি-পিসি হাতে দিয়ে বিদায় করলেন।

মাসি-পিসি ঘুমের দেশে চলে গেলেন, দিগনগরে দিঘির ঘাটে বরযাত্রীর ঘুম ভাঙল, গাঁয়ের ভিতর ঘরে ঘরে গ্রামবাসীর ঘুম ভাঙল। ষষ্ঠীঠাকরুন তাড়াতাড়ি মুখ মুছে কাঠামােয় ঢুকতে যাবেন, এমন সময় বানর গাছ থেকে লাফিয়ে পড়ে বলল— ঠাকরুন, পালাও কোথা, আগে ক্ষীবের ছেলে দিয়ে যাও! চুরি করে ক্ষীর খাওয়া ধরা পড়েছে, দেশ-বিদেশে কলঙ্ক রটাব।

ঠাকরুন ভয় পেয়ে বললেন- আঃ মর! এ মুখপােড়া বলে কী! সর সর, আমি পালাই, লােকে আমায় দেখতে পাবে! বানর বললে তা হবে না, আগে ছেলে দাও তবে ছেড়ে দেব। নয় তো কাঠামো-সুদ্ধ আজ তােমায় দিঘির জলে ডুবিয়ে যাব, দেবতা হয়ে ক্ষীর চুরির শাস্তি হবে।

ঠাকরুন লজ্জায় মরে গেলেন, ভয়ে কাপতে কাপতে বললেন— বাছা চুপ কর, কে কোন্ দিকে শুনতে পাবে? তাের ক্ষীরের ছেলে খেয়ে ফেলেছি ফিরে পাব কোথা? ওই বটতলায় আমার ছেলেরা খেলা করছে, তাের যেটিকে পছন্দ সেটিকে নিয়ে বিয়ে দিগে যা, অামার বরে দুওরানী তাকে আপনার ছেলের মতাে দেখবে, এখন আমায় ছেড়ে দে।

বানর বললে— কই ঠাকরুণ, বটতলায় তাে ছেলেরা নেই! আমায় দিব্যচক্ষু দাও তবে তাে ষষ্ঠীরদাস ষেঠের বাছাদের দেখতে পাব? ষষ্ঠীঠাকরুণ বানরের চোখে হাত বােলালেন, বানরের দিব্যচক্ষু হল।

ক্ষীরের পুতুল - সপ্তম অধ্যায়