Pitara logo

ক্ষীরের পুতুল - পঞ্চম অধ্যায়

ডাকিনী বিষের সন্ধানে গেল। বনে বনে খুজে খুজে ভরসন্ধ্যাবেলা ঝােপের আড়ালে ঘুমন্ত সাপকে মন্ত্রে বশ করে, তার মুখ থেকে কালকূট বিষ এনে দিল।

ছােটোরানী সেই বিষে মুগের নাড়ু, ক্ষীরের ছাচ, মতিচুর মেঠাই গড়ালেন। একখানা থালা সাজিয়ে ডাকিনী ব্রাহ্মণীকে বললেন— ভাই এক কাজ কর, এই বিষের নাড়ু, বড়রানীকে বেচে আয়।

ব্রাহ্মণী থালা হাতে বড়ােরানীর নতুন মহলে গেল।

বড়ােরানী বললেন— আয় লাে আয়, এতদিন কোথায় ছিলি? দুওরানী বলে কি ভুলে থাকতে হয় ?

ডাকিনী বললে সে কী গাে! তােমাদের খাই, তােমাদের পরি, তােমাদের কি ভুলতে পারি ? এই দেখ, তােমার জন্যে যতন করে মুগের নাড়ু, ক্ষীরের ছাচ, মতিচুর মেঠাই এনেছি।

রানী দেখলেন, বুড়ি ব্রাহ্মণী বড়ো যত্ন করে, থালা সাজিয়ে সামগ্রী এনেছে। খুশি হয়ে তার দুহাতে দুমুঠো মােহর দিয়ে বিদায় করলেন, ব্রাহ্মণী হাসতে হাসতে চলে গেল।

রানী ক্ষীরের ছাচ ভেঙে খেলেন, জিবের স্বাদ গেল। মুগের নাড়ু মুখে দিলেন, গলা কাঠ হল। মতিচুর মেঠাই খেলেন, বুক যেন জ্বলে গেল। বানরকে ডেকে বললেন- ব্রাহ্মণী আমায় কী খাওয়ালে। গা-কেমন করছে, বুঝি আর বাঁচব না।

বানর বললে চল্ মা, খাটে শুবি, অসুখ সারবে। রানী উঠে দাড়ালেন, সাপের বিষ মাথায় উঠল। রানী চোখে আঁধার দেখলেন, মাথা টলে গেল, সােনার প্রতিমা শানের উপর ঘুরে পড়লেন।

বানর রানীর মাথা কোলে নিলে, হাত ধরে নাড়ি দেখলে, চোখের পাতা খুলে চোখ দেখলে রানী অজ্ঞান, অসাড়!

বানর সােনার প্রতিমা বড়ােরানীকে সােনার খাটে শুইয়ে দিয়ে ওষুধের সন্ধানে বনে ছুটে গেল। বন থেকে কে জানে কী লতাপাতা, কোন গাছের কী শিকড় এনে নতুন শিলে বেটে বড়ােরানীকে খাওয়াতে লাগল।

রাজবাড়িতে খবর গেল বড়ােরানী বিষ খেয়েছেন। রাজা উঠতে-পড়তে রানীর মহলে এলেন। রাজমন্ত্রী ছুটতে ছুটতে সঙ্গে এলেন। রাজবৈদ্য মন্তর আওড়াতে আওড়াতে তারপর এলেন। তারপর রাজার লােক-লস্কর, দাসী-বাঁদী যে যেখানে ছিল হাজির হল।

বানর বললে— মহারাজ, এত লােক কেন এনেছ? আমি মাকে ওষুধ দিয়েছি, মা আমার ভালাে আছেন, একটু ঘুমােতে দাও। এত লােককে যেত বল। রাজা বিষের নাড়ু পরখ করিয়ে রাজবৈদ্যকে বিদায় করলেন। রাজ্যের ভার দিয়ে রাজমন্ত্রীকে বিদায় করলেন। বড়ােরানীর মহলে নিজে রইলেন।

তিন দিন, তিন রাত বড়ােরানী অজ্ঞান। চার দিনে জ্ঞান হল, বড়ােরানী চোখ মেলে চাইলেন। বানর রাজাকে এসে খবর দিলে মহারাজ, বড়ােরানী সেরে উঠেছেন, তােমার একটি রাজচক্রবর্তী ছেলে হয়েছে।

রাজা বানরকে হীরের হার খুলে দিয়ে বললেন— চল বানর, বড়ােরানীকে আর বড়ােরানীর ছেলেকে দেখে আসি।

বানর বললে— মহারাজ, গণনা করেছি ছেলের মুখ এখন দেখলে তোমার চক্ষু অন্ধ হবে। ছেলের বিয়ে হলে মুখ দেখাে, এখন বড়ােরানীকে দেখে এস ছোটোরানী কী দুর্দশা করেছে।

রাজা দেখলেন বিষের জ্বালায় বড়রানীর সােনার অঙ্গ কালি হয়ে গেছে, রানী পাতাখানার মতো পড়ে আছেন, রানীকে আর চেনা যায় না।

রাজা রাজবাড়িতে এসে ছােটোরানীকে প্রহরী-খানায় বন্ধ করলেন, আর ডাকিনী বুড়িকে মাথা মুড়িয়ে ঘোল ঢেলে, উলটো গাধায় চড়িয়ে দেশের বার করে দিলেন।

তারপর হুকুম দিলেন মন্ত্রীবর, আজ বড়ো শুভদিন, এতদিন পরে রাজচক্রবর্তী ছেলে পেয়েছি। তুমি পথে পথে আলো জ্বালাও, ঘরে ঘরে বাজি পােড়াও, দীন-ধী ডেকে রাজ ভান্ডার লুটিয়ে দাও, রাজ্যে যেন একটিও ভিখারী না-থাকে।

মন্ত্রী রাজার আজ্ঞায় নগরের পথে পথে আলাে দিলেন, ঘরে ঘরে বাজি পােড়ালেন, দীন-দুঃখীকে রাজভাণ্ডার লুটিয়ে দিলেন, রাজ্যে জয়-জয়কার হল।

এমনি করে নিত্য নতুন আমােদে, দেবতার মন্দিরে পূজা দিয়ে, মা কালীর পায়ে বলি দিয়ে দেখতে দেখতে দশ বৎসর কেটে গেল।

রাজা বানরকে ডেকে বললে— দশ বৎসর তো পূর্ণ হল এখন ছেলে দেখাও।

বানর বললে— মহারাজ, আগে ছেলের বৌ ঠিক কর, তারপর তার বিয়ে দাও, তারপর মুখ দেখাে! এখন ছেলে দেখলে অন্ধ হবে।

রাজা বানরের কথায় দেশ-বিদেশে ভাট পাঠালেন। কত দেশের কত রাজকন্যার সন্ধান এল, একটিও রাজার মনে ধরল না। শেষে পাটলী দেশের রাজার ভাট সােনার কৌটায় সােনার প্রতিমা রাজকন্যার ছবি নিয়ে এল! কন্যার অঙ্গের বরন কাঁচা সােনা, জোড়াভুরু বাঁকাধনু, দুটি চোখ টানা-টানা, দুটি ঠোট হাসি-হাসি, এলিয়ে দিলে মাথার কেশ পায়ে পড়ে। রাজার সেই কন্যা পছন্দ হল।

বানরকে ডেকে বললেন— ছেলের বৌ ঠিক করেছি, কাল শুভদিনে শুভলগ্নে বিয়ে দিতে যাব।

বানর বললে— মহারাজ, কাল সন্ধ্যাবেলা, বেহারা দিয়ে বরের পালকি মায়ের দুয়ারে পাঠিয়ে দিও, বরকে নিয়ে বিয়ে দিতে যাব।

রাজা বললেন— দেখাে বাপু, দশ বৎসর তােমার কথা শুনেছি, কাল ছেলে না-দেখালে অনর্থ করব।

বানর বললে, মহারাজ, সে ভাবনা নেই। তুমি বেহাই-বাড়ি চলে যাও, আমরা কাল বর নিয়ে যাব।

রাজা পাছে রানীর ছেলেকে দেখে ফেলেন, পাছে চক্ষু অন্ধ হয়, সেই ভয়ে তাড়াতাড়ি বেহাই-বাড়ি চলে গেলেন।

আর বানর নতুন-মহলে বড়ােরানী কাছে গেল। বড়ােরানী ছেলের বিয়ে শুনে অবধি পড়ে পড়ে কাঁদছেন আর ভাবছেন— ছেলে কোথা পাব, এবার রাজাকে কী ছলে ভােলাব!

বানর এসে বললে, গাে মা, ওঠ। চেলীর জোড় আন্, মাথার টোপর আন, ক্ষীরের ছেলে গড়ে দে, বর সাজিয়ে বিয়ে দিয়ে আনি।

রানী বললেন বাছারে, প্রাণে কি তাের ভয় নেই? কোন সাহসে ক্ষীরের পুতুল বর সাজিয়ে বিয়ে দিতে যাবি? রাজাকে কী ছলে ভােলাবি? বাছা কাজ নেই, ছল করে রাজার প্রেয়সী হলুম, সেই পাপে সতীন বিষ খাওয়ালে, ভাগ্যে-ভাগ্যে বেঁচে উঠেছি, আবার কোন্ সাহসে রাজার সঙ্গে ছল করব? বাছা ক্ষান্ত দে, কেন আর পাপের বােঝা বাড়াস! তুই রাজাকে ডেকে আন, আমি সব কথা খুলে বলি।

বানর বললে— রাজাকে পাব কোথা? দুদিনের পথ কনের বাড়ি, রাজা সেখানে গেছেন। তুই কথা রাখ, ক্ষীরের বর গড়ে দে। রাজা পথ চেয়ে আছেন কখন বর আসবে, বর না-এলে বড়াে অপমান। মা তুই ভাবিসনে, ক্ষীরের পুতুল বিয়ে দিতে পাঠালি, যদি ষষ্ঠীর কৃপা হয় তবে ষষ্ঠীদাস ষেঠের বাছা কোলে পাবি।

রানী বানরের ভরসায় বুক বেঁধে মনের মতাে ক্ষীরের ছেলে গড়লেন। তাকে চেলীর জোড় পরালেন, সােনার টোপর পরালেন, জরির জুতো পায়ে দিলেন।

বানর চুপি চুপি ক্ষীরের বর পালকিতে তুলে রঙিন ঢাকা নামিয়ে দিলে, বরের কেবল দুখানি ছােটো পা, দুপাটি জরির জুতো দেখা যেতে লাগল।

ষোলো জন কাহার বরের পাকি কাঁধে তুললে। বানর মাথায় পাগড়ি, কোমরে চাদর বেঁধে, নিশেন উড়িয়ে, ঢাক বাজিয়ে, আলো জ্বালিয়ে, ক্ষীরের পুতুলের বিয়ে দিতে গেল। রানী আঁধার পুরে একলা বসে বিপদ-ভঞ্জন বিঘ্নহরণকে ডাকতে লাগলেন।

এদিকে বর নিয়ে ষোলো কাহার, মশাল নিয়ে মশালধারী, ঢাক ঢােল নিয়ে ঢাকী চুলী, ঘােড়ায় চড়ে বরযাত্রী সারাবাত বাঁশি বাজিয়ে, আলাে জ্বালিয়ে ঘােড়া হাঁকিয়ে দিগনগরে এসে পড়ল।

দিগনগরে দিঘির ধারে ভাের হল। মশাল পুড়ে-পুড়ে নিবে গেল, ঘােড়া ছুটেছুটে বেদম হল, কাহার পালকি বয়ে হয়রান হল, ঢাক পিটে পিটে ঢাকীর হাতে খিল্ ধরল।

বানর দিঘির ধারে তাবু ফেলতে হুকুম দিলে। দিঘির ধারে ষষ্ঠীতলায় বরের পালকি নামিয়ে কাহারদের ছুটি দিলে, মন্ত্রীকে ডেকে বলে দিলে মন্ত্রীমশায়, রাজার হুকুম বরকে যেন কেউ না দেখে, আজকের দিনে বর দেখলে বড়াে অমঙ্গল।

ক্ষীরের পুতুল - ষষ্ঠ অধ্যায়