Pitara logo

ক্ষীরের পুতুল - চতুর্থ অধ্যায়

ছােটোরানী স্বপ্ন দেখে জেগে উঠে সােনার পালঙ্কে বসে বসে ভাবছেন, এমন সময় রাজা এসে খবর দিলেন– আরে শুনেছ ছছটোরানী, বড়রানীব ছেলে হবে! বড়ো ভাবনা ছিল রাজসিংহাসন কাকে দেব, এতদিনে ভাবনা ঘুচল। যদি ছেলে হয় তাকে রাজা করব, আর যদি মেয়ে হয়, তবে তার বিয়ে দিয়ে জামাইকে রাজ্য দেব। রানী, বড়াে ভাবনা ছিল, এতদিনে নিশ্চিন্ত হলুম।

রানী বললেন- পারিনে বাপু, আপনাব জ্বালায় বাঁচিনে, পরের ভাবনা!

রাজা বললেন— সে কী রানী? এমন সুখের দিন এমন কথা বলতে হয়? রাজপুত্র কোলে পাব, রাজ সিংহাসনে রাজা করব, এ কথা শুনে মুখভার করে ? রানী, রাজবাড়িতে সবার মুখে হাসি, তুমি কেন অকল্যাণ কর?

রানী বললেন— আর পারিনে! কার ছেলে রাজা হবে, কার মেয়ে রাজ্য পাবে, কে রাজসিংহাসনে বসবে, এত ভাবনা ভাবতে পারিনে। নিজের জ্বালায় মরি, পরের ছেলে মোলো বাঁচল তার খবর রাখিনে। বাবারে, সকালবেলা বকে বকে ঘুম হল না, মাথা ধরল, যাই নেয়ে আসি।

রাগভরে ছােটোরানী আটগাছা চুড়ি, দশগাছা মল ঝমঝমিয়ে একদিকে চলে গেলেন।

রাজার বড় রাগ হল, রাজকুমারকে ছােটোরানী মর বললে। রাজা মুখ আঁধার করে বার-মহলে চলে এলেন। রাজা-রানীতে ঝগড়া হল। রাজা আর ছােটোরানীর মুখ দেখলেন না, বড়ােরানীর ঘরেও গেলেন না ছােটোরানী শুনে যদি বিষ খাওয়ায়, বড়ােরানীকে প্রাণে মারে! রাজা বার-মহলে একলা রইলেন।

এক মাস গেল, দুমাস গেল, দুমাস গিয়ে তিন মাস গেল, রাজারানীর ভাব হল না। ঝগড়ায় ঝগড়ায় চার মাস কাটল। পাঁচ মাসে দুওরানীর পােষা বানর রাজার সঙ্গে দেখা করলে। রাজা বললেন– কী হে বানর, খবর কী?

বানর বললে– মহারাজ, মায়ের বড়াে দুঃখ! মােটা চালের ভাত মুখে রােচে না, মা আমার না-খেয়ে কাহিল হলেন।

রাজা বললেন— এ কথা তাে আমি জানিনে। মন্ত্রীবর, যাও এখনি সরু চালের ভাত, পঞ্চাশ ব্যঞ্জন, সােনার থালে সােনার বাটিতে বড়ােরানীকে পাঠিয়ে দাও। আজ থেকে আমি যা খাই বড়ােরানীও তাই খাবেন। যাও মন্ত্রী, বানরকে হাজার মােহর দিয়ে বিদায় কর।

মন্ত্রী বানরকে বিদায় করে রান্নাঘরে গেলেন। আর বানীর বানর মােহরের তােড়া নিয়ে রানীর কাছে এল।

রানী বললেন— আজ আবার কোথা ছিলি? এতখানি বেলা হল নাইতে পেলুম না, রাঁধব কখন, খাব কখন ?

বানর বললে- মা আর তােকে রাধতে হবে না। রাজবাড়ি থেকে সােনার থালায় সােনার বাটিতে সরু চালের ভাত, পঞ্চাশ ব্যঞ্জন আসবে, তাড়াতাড়ি নেয়ে আয়।

রানী নাইতে গেলেন। বানর একমুঠো মােহর নিয়ে বাজারে গেল। ষোলো থান মােহরে ষোলো জন ঘরামি নিলে, ষোলো গাড়ি খড় নিলে, ষোলোশো বাঁশ নিলে। সেই ষোলোশো বাঁশ দিয়ে, ষোলো গাড়ি খড় দিয়ে, ষোলজন ঘরামি খাটিয়ে, চক্ষের নিমেষে দুওরানীর বানর ভাঙাঘর নতুন করলে। শোবার ঘরে নতুন কাঁথা পাতলে, খাবার ঘরে নতুন পিড়ি পাতলে, রাজবাড়ির ষোলো বামুনে রানীর ভাত নিয়ে এল; ষােলাে মােহর বিদায় পেলে।

দুওরানী নেয়ে এলেন। এসে দেখলেন— ঘর নতুন! ঘরের চাল নতুন! চালের খড় নতুন! মেঝেয় নতুন কাঁথা! আলনায় নতুন শাড়ি! রানী অবাক হলেন। বানরকে বললেন- বাছা, ভাঙা ঘর দেখে ঘটে গেলুম, এসে দেখি নতুন ঘর! কেমন করে হল?

বানর বলল- মা, রাজামশায় মােহর দিয়েছেন। সেই মােহরে ভাঙা ঘর নতুন করেছি, ছেড়া কাঁথা নতুন করেছি, নতুন পিঁড়ে পেতেছি, তুই সোনার থালে গবম ভাত, সোনার বাটিতে তপ্ত দুধ খাবি চল।

রানী থেতে বসলেন। কতদিন পরে সোনার থালায় ভাত খেলেন, সােনার ঘটিতে মুখ ধুলেন, সােনার বাটায় পান খেলেন, তবু মনে সুখ পেলেন না। রানী রাজভােগ খান আর ভাবেন আজ রাজা সোনার থালে ভাত পাঠালেন, কাল হয়তো মশানে নিয়ে মাথা কাটবেন।

এমনি করে ভয়ে-ভয়ে এক মাস, দুমাস, তিন মাস গেল। বড়ােরানীর নতুন ঘব পুরোনো হল, ঘরের চাল ফুটো হল, চালের খড় উড়ে গেল। বানর রাজার সঙ্গে দেখা করলে।

রাজা বললেন— কী বানর, কী মনে করে?

বানর বললে— মহারাজ, ভয়ে কব না নির্ভয়ে কব? রাজা বললেন— নির্ভয়ে কও।

বানর বললে— মহারাজ, ভাঙা ঘরে মা আমার বড়ো দুঃখ পান। ঘরের দুয়াের ফাটা, চালে খড় নেই, শীতের হিম ঘরে আসে। মা আমার গায়ে দিতে নেপ পান না, আগুন জ্বলতে কাঠ পান না, সারা রাত শীতে কাঁপেন।

রাজা বললেন— তাইতো! তাইতাে! একথা বলতে হয়। বানর তোর মাকে রাজবাড়িতে নিয়ে আয়, আমি মহল সাজাতে বলি।

বানর বললে— মহারাজ, মাকে আনতে ভয় হয়, ছােটোরানী বিষ খাওয়াবে।

রাজা বললেন— সে ভয় নেই। নতুন মহলে রানীকে রাখব, মহল ঘিরে গড় কাটাব, গড়ের দুয়ারে পাহারা বসাব, ছােটোরানী আসতে পাবে না। সে মহলে বড়ােরানী থাকবেন, বড়ােরানীর বােবাকালা দাই থাকবে, আর বড়ােরানীর পোষা ছেলে তুই থাকবি।

বানর বললে— মহারাজ, যাই তবে মাকে আনি। রাজা বললেন— যাও মন্ত্রী, মহল সাজাও গে।

মন্ত্রী লক্ষ লক্ষ লােক লাগিয়ে একদিনে দুওরানীর নতুন মহল সাজালেন।

দুওরানী ভাঙা ঘর ছেড়ে, ছেড়া কাঁথা ছেড়ে, সােনার শাড়ি পরে নতুন মহলে এলেন। সােনার পালঙ্কে বসলেন, সােনা থালে ভাত খেলেন, দীন-দুঃখীকে দান দিলেন, রাজ্যে জয় জয় হল; রাগে ছােটোরানীর সর্বাঙ্গ জ্বলে উঠল।

ডাকিনী ব্রাহ্মণী ছােটোরানীৰ ‘মনের কথা’, প্রাণের বন্ধু। ছােটোরানী বলে পাঠালেন— মনের কথাকে আসতে বল, কথা আছে।

রানী ডেকেছেন— ডাকিনী বুড়ি তাড়াতাড়ি চলে এল। রানী বললেন— এস ভাই, মনের কথা, কেমন আছ? কাছে বােসাে।

ডাকিনী ব্রাহ্মণী ছােটোরানীর পাশে বসে বললে— কেন ভাই, ডেকেছ কেন? মুখখানি ভার-ভার, চোখের কোণে জল, হয়েছে কী?

রানী বললেন— হয়েছে আমার মাথা আর মুন্ডু! সতীন আবার ঘরে ঢুকেছে, সে সােনার শাড়ি পরেছে, নতুন মহল পেয়েছে, রাজাব প্রেয়সী রানী হয়েছে। ভিখারিনী দুওরানী এত দিনে সুওরানীর রানী হয়ে রাজমহল জুড়ে বসেছে। বামুন সই, দেখে অঙ্গ জ্বলে গেল, আমায় বিষ দে খেয়ে মরি, সতীনের এ আদর প্রাণে সয় না।

ব্রাহ্মণী বললে- ছি! ছি! সই ও কথা কি মুখে আনে।

কোন্ দুঃখে বিষ খাবে? দুওরানী আজ রানী হয়েছে, কাল ভিখারিনী হবে, তুমি যেমন সুওরানী তেমনি থাকবে।

সুওরানী বললেন— না-ভাই, বাঁচতে আর সাধ নাই। আজ বাদে কাল দুওরানীর ছেলে হবে, সে ছেলে রাজা হবে! লােকে বলবে আহা, দুওরানী রত্নগর্ভা, রাজার মা হল! আর দেখনা, পােড়ামুখী সুওরানী মহারাজার সুওরানী হল, তবু রাজার কোলে দিতে ছেলে পেলে না! ছি! ছি! অমন অভাগীর মুখ দেখেনা, নাম করলে সারাদিন উপােস যায়! ভাই, এ গঞ্জনা প্রাণে সবে না। তুই বিষ দে, হয় আমি খাই, নয়তাে সতীনকে খাওয়াই।

ব্রাহ্মণী বললে— চুপ কর রানী, কে কোন্ দিকে শুনতে পাবে। ভাবনা কী? চুপি চুপি বিষ এনে দেব, দুওরানীকে খেতে দিও। এখন বিদায় দাও, বিষের সন্ধানে যাই।

রানী বললেন— যাও ভাই। কিন্তু দেখো, বিষ যেন আসল হয়, খেতে-না-খেতে বড়ােরানী ঘুরে পড়বে।

ডাকিনী বললে ভয় নেই গাে, ভয় নেই! আজ বাদে কাল বড়ােরানীকে বিষ খাওয়াব, জন্মের মতাে মা হবার সাধ ঘােচাব, তুমি নির্ভয়ে থাক।

ক্ষীরের পুতুল - পঞ্চম অধ্যায়