Pitara logo

ক্ষীরের পুতুল - দ্বিতীয় অধ্যায়

সন্ধ্যাবেলা সোনার জাহাজ সােনার পাল মেলে অগাধ সাগরের নীল জল কেটে সােনার মেঘের মতো পশ্চিম মুখে ভেসে গেল।

ভাঙা ঘরে দুওরানী নীল সাগরের পারে চেয়ে, ছেড়া কাঁথায় পড়ে রইলেন। আর আদরিনী সুওরানী সাতমহল অন্তঃপুরে, সাতশাে সখীর মাঝে, গহনার কথা ভাবতে ভাবতে, সােনার পিঞ্জরে শােনার পাখির গান শুনতে শুনতে, সােনার পালঙ্কে ঘুমিয়ে পড়লেন।

রাজাও জাহাজে চড়ে দুঃখিনী বড়োরানীকে ভুলে গেলেন। বিদায়ের দিনে ছােটোরানীব সেই হাসিহাসি মুখ মনে পড়ে আর ভাবেন— এখন রানী কী করছেন? বোধ হয় চুল বাঁধছেন। এবার রানী কী করছেন? বুঝি রাঙা পায়ে আলতা পরছেন। এবার রানী সাত মালঞ্চে ফুল তুলছেন, এবার বুঝি সাত মালঞ্চের সাত সাজি ফুলে রানী মালা গাথিছেন আর আমার কথা ভাবছেন। ভাবতে ভাবতে বুঝি দুই চক্ষে জল এল, মালা আর গাঁথা হল না। সােনার সুতাে, ফুলের সাজি পায়ের কাছে পড়ে রইল; বসে বসে সারা রাত কেটে গেল, রানীর চোখে ঘুম এল না।

সুওরানী ছােটোরানী রাজার আদরিনী, রাজা তারই কথা ভাবেন। আর বড়ােরানী রাজার জন্যে পাগল, তার কথা একবার মনেও পড়ে না।

এমনি করে জাহাজে দেশ-বিদেশে রাজার বারো-মাস কেটে গেল। তেরাে মাসে রাজার জাহাজ মানিকের দেশে এল।

মানিকের দেশ সকলই মানিক। ঘরের দেওয়াল মানিক, ঘাটের শান মানিক, পথের কাঁকর মানিক। রাজা সেই মানিকের দেশে সুয়ােরানীর চুড়ি গড়ালেন। আট হাজার মানিকের আটগাছি চুড়ি, পরলে মনে হয় গায়ের রক্ত ফুটে পড়ছে।

রাজা সেই মানিকের চুড়ি নিয়ে, সােনার দেশে এলেন। সেই সােনার দেশে স্যাকরার দোকানে নিরেট সােনার দশগাছা মল গড়ালেন। মল জ্বলতে লাগল যেন আগুনের ফিনকি, বাজতে লাগল যেন বীণার ঝংকার মন্দিরার রিনি-রিনি। রাজা মানিকের দেশে মানিকের চুড়ি নিয়ে, সােনার দেশে সােনার মল গড়িয়ে, মুক্তোর রাজ্যে এলেন।

সে দেশে রাজার বাগানে দুটি পায়রা। তাদের মুক্তোর পা, মানিকের ঠোট, পান্নার গাছে মুক্তব ফল খেয়ে মুক্তোর ডিম পাড়ে। দেশের রানী সন্ধ্যাবেলা সেই মুক্তোর মালা গাঁথেন, রাতের বেলায় খোপায় পারেন, সকাল বেলায় ফেলে দেন।

দাসীরা সেই বাসি মুক্তোর হার এক জাহাজ রুপো নিয়ে বাজারে বেচে আসে। রাজা এক জাহাজ রুপাে দিয়ে সুওরানীর গলায় দিতে সেই মুক্তোর এক ছড়া হার কিনলেন।

তারপর মানিকের চুড়ি নিয়ে, সোনার দেশে সােনার মল গড়িয়ে, মুক্তোর রাজ্যে মুক্তোৰ হার গাঁথিয়ে, ছ’মাস পরে রাজা এক দেশে এলেন। সে দেশে রাজকন্যের উপবনে নীল মানিকের গাছে নীল গুটিপােকা নীলকান্ত মণির পান খেয়ে, জলের মতাে চিকন, বাতাসের মতো ফুরফুরে, আকাশের মত নীল রেশমের গুটি বাধে। রাজার মেয়ে সারা রাত ছাদে বসে, আকাশের সঙ্গে রঙ মিলিয়ে, সেই নীল রেশমে শাড়ি বােনেন। একখানি শাড়ি বুনতে ছ’মাস যায়। রাজকন্যে একটি দিন সেই আকাশের মতাে নীল, বাতাসের মত ফুরফুরে, জলের মতাে চিকন শাড়ি পরে শিবের মন্দিরে মহাদেব নীলকণ্ঠের পূজা করেন। ঘরে এসে শাড়ি ছেড়ে দেন, দাসীরা যার কাছে সাত জাহাজ সােনা পায় তার কাছে শাড়ি বেচে। রাজা সাত জাহাজ সােনা দিয়ে আদরিনী শুওরানীর শখের শাড়ি কিনলেন।

তারপর আর দু’মাসে রাজার সাতখানা জাহাজ সাত সমুদ্র তেরাে নদী পার হয়ে ছােটোরানীর মানিকের চুড়ি, সােনার মল, মুক্তোর মালা, সাধের শাড়ি নিয়ে দেশে এল। তখন রাজার মনে পড়ল। বড়ােরানী বাঁদর চেয়েছেন।

রাজা মন্ত্রীকে বললেন মন্ত্রীবর, বড়াে ভুল হয়েছে। বড়ােরানীর বাঁদর আনা হয়নি, তুমি একটা বাঁদরের সন্ধানে যাও।

রাজমন্ত্রী একটা বাঁদরের সন্ধানে চলে গেলেন। আর রাজা শ্বেতহস্তী চড়ে লােকারণ্য রাজপথ দিয়ে, ছােটারানীর সাধের গহনা শখের শাড়ি নিয়ে অন্তঃপুরে চলে গেলেন।

ছােটোরানী সাত-মহল বাড়ির সাত-তলার উপরে সােনার আয়না সামনে রেখে, সােনার কাঁকুইয়ে চুল চিরে, সােনার কাটা সােনার দড়ি দিয়ে খোপা বেঁধে সােনার চেয়াড়িতে সিঁদুর নিয়ে ভুরুর মাঝে টিপ পরছেন, কাজল-লতায় কাজল পেড়ে চোখের পাতায় কাজল পরছেন, রাঙা পায়ে আলতা দিচ্ছেন, সখীরা ফুলের থালা নিয়ে, পানের বাটা নিয়ে রাজরানী ছােটোরানীর সেবা করছে রাজা সেখানে এলেন। স্ফটিকের সিংহাসনে রানীর পাশে বসে বললেন– এই নাও, রানী! মানিকের দেশে মানিকের ঘাট, মানিকের বাট— সেখান থেকে হাতের চুড়ি এনেছি। সােনার দেশে সােনার ধুলাে, সােনার বালি— সেখান থেকে পায়ের মল এনেছি। মুক্তোর রাজ্যে মুক্তোর পা, মানিকের ঠোট, দুটি পাখি মুক্তোর ডিম পাড়ে। দেশের রানী সেই মুক্তোর হার গাঁথেন, রাতের বেলায় খোঁপায় পরেন, ভােরের বেলায় ফেলে দেন। রানী, তােমার জন্যে সেই মুক্তোর হার এনেছি। রানী, এক দেশে রাজার মেয়ে, এক-খী রেশমে সাত-খী সুত কেটে নিশুতি রাতে ছাদে বসে ছ’টি মাসে একখানি শাড়ি বােনেন, এক দিন পরে পুজো করে, ঘরে এসে ছেড়ে দেন। রানী, আমি সেই রাজার মেয়ের দেশ থেকে সাত জাহাজ সােনা দিয়ে রাজকন্যার হাতে বােনা শাড়ি এনেছি। তুমি একবার চেয়ে দেখ! পৃথিবী খুঁজে গায়ের গহনা পরনের শাড়ি আনলুম, একবার পরে দেখ! রানী তখন দু’হাতে আটগাছা চুড়ি পরলেন; মানিকের চুড়ি রানীর হাতে ঢিলে হল, হাতের চুড়ি কাঁধে উঠল।

রানী তখন দু’পায়ে দশ-গাছা মল পরলেন; রাঙা পায়ে সােনার মল আলগা হল, দু’পা যেতে দশ গাছ মল শানের উপর খসে পড়ল। রানী মুখ ভার করে মুক্তোর হার গলায় পরালেন; মুক্তোর দেশের। মুক্তোর হার রানীর গলায় খাটো হল, হার পরতে গলার মাস কেটে গেল। রানী ব্যথা পেলেন।

সাত-পুরু করে শখের শাড়ি অঙ্গে পরলেন; নীল রেশমের নীল শাড়ি হাতে বহরে কম পড়ল। রানীর চোখে জল এল।

তখন মানিনী ছােটোরানী আট হাজার মানিকের আটগাছা চুড়ি খুলে ফেলে, নিরেট সােনার দশগাছা মল পায়ে ঠেলে, মুক্তোর মালা শখের শাড়ি ধুলােয় ফেলে বললেন- ছাই গহনা! ছাই এ শাড়ি। কোন্ পথের কাকর কুড়িয়ে এ চুড়ি গড়ালে? মহারাজ, কোন্ দেশের ধুলো বালিতে এ মল গড়ালে ? ছি ছি, এ কার বাসি মুক্তোর বাসি হার! এ কোন্ রাজকন্যার পর শাড়ি! দেখলে যে ঘৃণা আসে, পরতে যে লজ্জা হয়! নিয়ে যাও মহারাজ, এ পরা শাড়ি পরা-গহনায় আমার কাজ নেই।

রানী অভিমানে গােসা-ঘরে খিল দিলেন। আর রাজা মলিনমুখে সাত জাহাজ সােনা দিয়ে কেনা সেই সাধের গহনা, শখের শাড়ি নিয়ে রাজসভায় এলেন।

ক্ষীরের পুতুল - তৃতীয় অধ্যায়