Pitara logo

ক্ষীরের পুতুল - প্রথম অধ্যায়

এক রাজার দুই রানী, দুও অরি সুও। রাজবাড়িতে সুওরানীর বড়াে আদর, বড়ো যত্ন। সুওরানী সাতমহল বাড়িতে থাকেন। সাতশাে দাসী তাঁর সেবা করে, পা ধােয়ায়, আলতা পরায়, চুল বাধে। সাত মালঞ্চের সাত সাজি ফুল, সেই ফুলে সুওরানী মালা গাঁথেন। সাত সিক-ভরা সাত-বাজার-ধন মানিকের গহনা, সেই গহনা অঙ্গে পরেন। সুওরানী রাজার প্রাণ।

আর দুওরানী— বড়োরানী, তাঁর বড়ো অনাদর, বড়াে অযত্ন। রাজা বিষ নয়নে দেখেন। একখানি ঘর দিয়েছেন— ভাঙাচোরা, এক দাসী দিয়েছেন- বোবা-কালা। পরতে দিয়েছেন জীর্ণ শাড়ি, শুতে দিয়েছেন- ছেড়া কাথা। দুওরানীর ঘরে রাজা একটি দিন আসেন, একবার বলেন, একটি কথা কয়ে উঠে যান।

সুওৱানী ছােটোরানী, তারই ঘরে রাজা বারােমাস থাকেন।

একদিন রাজা রাজমন্ত্রীকে ডেকে বললেন মন্ত্রী, দেশবিদেশ বেড়াতে যাব, তুমি জাহাজ সাজাও।

রাজার আজ্ঞায় রাজমন্ত্রী জাহাজ সাজাতে গেলেন। সাতখানা জাহাজ সাজাতে সাত মাস গেল। দু’খানা জাহাজে রাজার চাকরবাকর যাবে, আর সোনার চাঁদোয়া-ঢাকা সোনার জাহাজে রাজা নিজে যাবেন। মন্ত্রী এসে খবর দিলেন মহারাজ, জাহাজ প্রস্তুত। রাজা বললেন কাল যাব। মন্ত্রী ঘরে গেলেন।

ছােটোরানী সুওরানী রাজ-অন্তঃপুরে সােনার পালঙ্কে শুয়েছিলেন, সাত সখী সেবা করছিল, রাজা সেখানে গেলেন। সােনার পালঙ্কে মাথার শিয়রে বসে আদরের ছােটোরানীকে বললেন—রানী, দেশ-বিদেশ বেড়াতে যাব, তােমার জন্য কী আনব?

রানী ননীর হাতে হীরের চুড়ি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বললেন- হীরের রঙ বড় শাদা, হাত যেন শুধু দেখায়। রক্তের মতাে রাঙা আট-আট গাছা মানিকের চুড়ি পাই তাে পরি।

রাজা বললেন আচ্ছা রানী, মানিকের দেশ থেকে মানিকের চুড়ি আনব।

রানী রাঙা পা নাচিয়ে নাচিয়ে, পায়ের নুপুর বাজিয়ে বাজিয়ে বললেন- এ নূপুর ভালাে বাজে না। আগুনের বরন নিরেট সােনার দশ গাছা মল পাই তো পরি।

রাজা বললেন সােনার দেশ থেকে তােমার পায়ের সােনার মল আনব।

রানী গলার গজমতি হার দেখিয়ে বললেন- দেখ রাজা, এ মুক্তো বড় ছােটো, শুনেছি কোন দেশে পায়রার ডিমের মতাে মুক্তো আছে, তারি একছড়া হার এনাে।

রাজা বললেন সাগরের মাঝে মুক্তোর রাজ্য, সেখান থেকে গলার হার আনব। আর কী আনব রানী?

তখন আদরিনী সুরানী সােনার অঙ্গে সােনার আঁচল টেনে বললেন- মা গাে, শাড়ি নয় তত বােঝা! আকাশের মতাে নীল, বাতাসের মতাে ফুরফুরে, জলের মতাে চিকন শাড়ি পাই তাে পরে বাঁচি।

রাজা বললেন- আহা, আহা, তাই তাে রানী, সােনার আঁচলে সােনার অঙ্গে ছড় লেগেছে, ননীর দেহে ব্যাথা বেজেছে। রানী, হাসিমুখে বিদায় দাও, আকাশের মতাে নীল, বাতাসের মতাে ফুরফুরে, জলের মতো চিকন শাড়ি আনিগে।

ছােটোরানী হাসিমুখে রাজাকে বিদায় করলেন।

রাজা বিদায় হয়ে জাহাজে চড়বেন- মনে পড়ল দুখিনী বড়রানীকে।

দুওরানী বড়ােরানী, ভাঙা ঘরে ছেড়া কাঁথায় শুয়ে কাদছেন, রাজা সেখানে এলেন।

ভাঙা ঘরের ভাঙা দুয়ারে দাড়িয়ে বললেন- বড়ােরানী, আমি বিদেশ যাব। ছােটোরানীর জন্যে হাতের বালা, গলার মালা, পায়ের মল, পরনের শাড়ি আনব। তােমার জন্যে কী আনব ? বলে দাও যদি কিছু সাধ থাকে।

রানী বললেন— মহারাজ, ভালােয় ভালােয় তুমি ঘরে এলেই আমার সকল সাধ পূর্ণ হয়। তুমি যখন আমার ছিলে তখন আমার সােহাগও অনেক ছিল, সাধও অনেক ছিল। সােনার শাড়ি অঙ্গে পবে সাতমহল বাড়িতে হাজার হাজার আলাে জ্বালিয়ে সাতশাে সখীর মাঝে রানী হয়ে বসবার সাধ ছিল, সােনার পিঞ্জরে শুক-শারীর পায়ে সােনার নূপুর পরিয়ে দেবার সাধ ছিল। মহারাজ, অনেক সাধ ছিল, অনেক সাধ মিটেছে। এখন আর সােনার গহনায় সােনার শাড়িতে কী কাজ? মহারাজ, আমি কার সােহগে হীরের বালা হাতে পরব? মােতির মালা গলায় দেব? মানিকের সিথি মাথায় বাঁধব? মহারাজ, সেদিন কি আর আছে! তুমি সােনার গহনা দেবে, সে সােহাগ তো ফিরে দেবে না। আমার সে সাতশাে দাসী সাতমহল বাড়ি তো ফিরে দেবে না! বনের পাখি এনে দেবে, কিন্তু, মহারাজ, সোনার খাঁচা তে দেবে না! ভাঙা ঘরে সােনার গহনা চোর-ডাকাতে লুটে নেবে, ভাঙা খাঁচায় বনের পাখি কেন ধরা দেবে? মহারাজ, তুমি যাও, যাকে সােহাগ দিয়েছ তার সাধ মেটাওগে, ছাই সাধে আমার কাজ নেই।

রাজা বললেন – না রানী, তা হবে না, লােকে শুনলে নিন্দে করবে। বল তােমার কী সাধ?

রানী বললেন কোন লাজে গহনার কথা মুখে আনব? মহারাজ, আমার জন্যে পােড়ারমুখ একটা বাঁদর এনাে।

রাজা বললেন- আচ্ছা রানী, বিদায় দাও।

তখন বড়ােরানী- দুওরানী ছেড়া কাঁথায় লুটিয়ে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে রাজাকে বিদায় দিলেন। রাজা গিয়ে জাহাজে চড়লেন।

ক্ষীরের পুতুল - দ্বিতীয় অধ্যায়