Pitara logo

ওয়াসিলিসা

ওয়াসিলিসা এক সওদাগরের মেয়ে। তার মা ছিল না, কেউ ছিল না। ছিল খালি এক দুষ্ট, সৎমা আর ছিল সেই সৎমার দুটো ডাইনির মতাে মেয়ে।

ওয়াসিলিসার মা যখন মারা যান, তখন তিনি তাকে একটা কাঠের পুতুল দিয়েছিলেন আর বলেছিলেন, “একে কখনাে ছেড়ো না, সর্বদা কাছে কাছে রেখাে, আর যখন তােমার বিপদ-আপদ ঘটবে, একে চারটি কিছ, খেতে দিও। তবেই দেখবে, এ মানুষের মতাে তোমার সঙ্গে কথা বলবে; তখন এর পরামর্শ মতাে চোলাে।” তার পরে এতদিনে ওয়াসিলিসা বড় হয়ে উঠেছে।

সৎমা তার মেয়েদের সঙ্গে মিলে কেবল ওয়াসিলিসার অনিষ্ট চেষ্টা করত। ওয়াসিলিসা দেখতে যেমন সুন্দর, তার কথাবার্তা তেমনি মিষ্টি। গ্রামের যত লােক সবাই তাকে ভালােবাসে। আর সেই সৎমাটার যে দুটো মেয়ে–তাদের দাঁত যেমন উঁচু, চোখ তেমনি টেরা, নাক তার চেয়েও বাঁকা, আর তার ওপরে তারা এমনি দুষ্টু আর হিংসুকে আর ঝগড়াটে, তাদের কে ভালােবাসবে? তাই তারা হিংসায় ওয়াসিলিসাকে ধরে মারত। গ্রামের এক কিনারায় ওয়াসিলিসাদের বাড়ি আর বাড়ির পাশেই প্রকাণ্ড বন। সেই বনের মধ্যে সবুজ মাঠের ওপরে ডাইনিবুড়ি বাবায়াগার বাড়ি। সে বুড়ি মানুষ খায় সব মেয়েদের ধরতে পেলে তো খুব উৎসাহ করেই খায়!

একদিন রাত্রে দুষ্টু সৎমা তার মেয়েদের বললো, “এক কাজ কর। ঘরের আগুনটা নিবিয়ে দে তো তা হলেই ওয়াসিলিসাকে আবার আগুন আনবার জন্যে সেই সবুজ মাঠে বাবায়াগার বাড়িতে পাঠানো হবে, আর বাবায়াগা তাকে ধরে গিলে ফেলবে। কেমন মজা।” যেই এ কথা বলা অমনি বড়ো মেয়েটা উঠে ইচ্ছে করে ছাইমাটি চাপা দিয়ে আগুন নিবিয়ে দিলো। আর সকলে চেঁচাতে লাগলো “ঐ যা! আগুন তো নিবে গেলো। ওয়াসিলিসা! ওয়াসিলিসা! শিগগির ওঠো। বনের মধ্যে সবুজ মাঠ আছে, তার মধ্যে বাবায়াগার বাড়ি, তার বাড়ির আগুন নাকি কখনো নিবে যায় না। শিগগির যাও, দৌড়ে যাও, সে আগুন খানিকটা নিয়ে এস।”

এই না বলে তারা ওয়াসিলিসার চুল ধরে হিড় হিড় করে টেনে তাকে বাড়ির বাইরে তাড়িয়ে দিয়ে, ঘরে খিল এঁটে দিলো। ওয়াসিলিসা বাইরে বসে কাঁদছে, এমন সময় তার সেই ছােট্ট কাঠের পুতুলের কথা মনে হল। তখন সে তাড়াতাড়ি তার কাপড়ের মধ্যে থেকে পুতুলটাকে বের করে তার মুখে একটু খাবার দিয়ে বলতে লাগল, “কাঠের পুতুল, খাবার খাও. আবার তুমি জ্যান্ত হও, আমার সঙ্গে কথা কও। অমনি কাঠের পুতুলের চোখ দুটো জলে উঠল, ঠোঁট দুটো নড়ে উঠল― তারপর সে বলতে লাগল, “কাঠের পুতুল সঙ্গে রয়, ওয়াসিলিসার কিসের ভয়? তুমি ভয় পেও না, বাবায়াগার বাড়ি সােজা চলে যাও।”

ওয়াসিলিসা চলতে লাগল। রাত গেল, সকাল গেল, দুপর গেল, তখন দেখা গেল সবুজ মাঠ, তার ঠিক মধ্যখানে ভাঙাচোরা সাদা শাড়ি, তার গায়ে সারি সারি মড়ার খুলি, তার দরজা জানলা ফটক কবাট সব আস্ত আস্ত হাড়ের তৈরি। হুড়কো, কবজা, কাঁটা, পেরেক কোথাও কিছু নেই—কিছু দিয়ে বাঁধা নেই, জোড়া নেই, অথচ বাড়িখানা চারটে পাখির ঠ্যাঙের উপর ঠিক দাঁড়িয়ে রয়েছে।

ওয়াসিলিসা অবাক হয়ে দেখছে, এমন সময় হঠাৎ একটা সাদা লোক ঝকঝকে সাদা পােশাক পরে, সাদা ঘােড়ায় চড়ে সাঁই সাঁই করে কোথা থেকে ছুটে এলাে। এসেই, সােজা বাড়ির ফটকের ওপরে ছটে পড়ল আর ধাঁ করে বাড়ির সঙ্গে মিশে গেল। ওয়াসিলিসা চেয়ে দেখল, তখন বিকেল হয়ে এসেছে, রােদ পড়ে আসছে।

তারপর একজন লােক এল, রাঙা সূর্যের মতাে লাল তার রঙ—তার পােশাক, তার ঘােড়া, সবই লাল। সেও তেমনি ছুটে গিয়ে বাড়ির মধ্যে মিশে গেল। ওয়াসিলিসা দেখল, সন্ধে হয়েছে চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে।

তারপর একজন এল অন্ধকারের মতাে কালাে কালাে পােশাক, কালাে ঘোড়া। সে যেই বাড়ির মধ্যে মিশে গেল আর চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার, কেবল সেই বাড়ির গায়ে মড়ার খলিগুলাে আপনা থেকে ঝকঝক করে জলে উঠল—আর দাঁত বের করে চারিদিকে আলাে ছড়াতে লাগল।

তারপরে একটা প্রকাণ্ড হামানদিস্তা হাঁকিয়ে বাবায়াগা নিজে এসে হাজির। সে এসেই তাে ওয়াসিলিসার গন্ধ পেয়ে তাকে ধরে নিয়ে গেল। ওয়াসিলিসা আগন নিতে এসেছে শুনেই সে বলল, “বটে! আগনের বুঝি দাম লাগে না? তিন দিন আমার বাড়িতে কাজ কর—যদি ভালাে কাজ করতে পারিস আগুন পাবি; আর তা যদি না পারিস তােকে আমি ঝােল রেঁধে খাব। আচ্ছা, এখন আমার খাবারগুলো উনুন থেকে নামিয়ে আমায় দে তাে!”

ওয়াসিলিসা খাবার এনে দিল। বুড়ি চেটেপুটে খেয়ে বলল, “কাল সকালে আমি বেরিয়ে যাব। সন্ধ্যার সময় এসে যেন দেখতে পাই—আমার ঘর ঝাঁট দেওয়া হয়েছে, আমার রান্না ঠিকমত করা হয়েছে, আর ঐ কোণে এক বড়ি সােনার ধান দেখবি তার মধ্যে অনেক কাঁকর, অনেক খুদ, আর তার চাইতেও বেশি কালাে বান মেশানাে আছে—সমস্ত ঝেড়ে বেছে রাখিস। খবরদার কিছু ভুল হয় না যেন।”

ওয়াসিলিসা বসে বসে কাঁদতে লাগল। তখন তার কাঠের পুতুলের কথা মনে হ’ল। সে পুতুলের মুখে একটু খাবার দিয়ে বলতে লাগল, “কাঠের পুতুল, খাবার খাও, আবার তুমি জ্যান্ত হও আমার সঙ্গে কথা কও।” কাঠের পুতুলের চোখ দুটো জলে উঠল, ঠোঁট দুটো নড়ে উঠল, সে বলতে লাগল—“কাঠের পুতুল সঙ্গে রয়, ওয়াসিলিসার কিসের ভয়? তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমােও গিয়ে।”

ওয়াসিলিসা ঘুমােতে লাগল। সকালবেলায় বাবায়াগা তার হামানদিস্তায় চড়ে বেরিয়ে গেল। আর কি আশ্চর্য! ঘরদোর সব আপনা থেকে ঝাট হয়ে গেল। খাবার গুলাে উননে চড়ে আপনা থেকে সিদ্ধ হতে লাগল। ওয়াসিলিসা অবাক হয়ে সেই ধানগলাে দেখতে গিয়ে দেখে তার কাঠের পুতুল সমত ধান বেছে সােনার ধান, কালাে ধান, কাঁকর আর খুদ সব আলগা করে ফেলেছে।

বিকেলবেলা সাদা লােকটা ফিরে এল, সন্ধের সময় লাল লােকটা ফিরে এল আর ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত্রে কালাে লােকটা ফিরে এল—তারপর ঝমঝম খট খটাং করে হামানদিস্তা হাঁকিয়ে বাবায়াগা ঘরে এল। এসেই সে হামানদিস্তার বাটটা দিয়ে ঘরের সব জায়গায় ধাই ধাই করে মেরে দেখতে লাগল, কোনখান থেকে ধুলাে পড়েকিনা! তারপর যখন সে দেখল ঝাঁট দেওয়াও ঠিক হয়েছে, খাবারও রান্না হয়েছে, ধানও বাছা হয়েছে, তখন সে রেগে চিৎকার করে বলতে লাগল, “হতভাগি মেয়ে, কে তােকে বাঁচিয়েছে—শিগগির আমায় বল।” ওয়াসিলিসা ভয়ে কাঁপতে কতে বলল, “আমার মা মারা যাবার সময় আমায় যা আশীর্বাদ করেছিলেন, তাতেই আমি বেচেছি।” এই না শুনে ডাইনিবুড়ি ভয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল, “ওরে বাবা রে! কার আশীর্বাদ নিয়ে আমার বাড়ি এসেছে রে! আমার সর্বনাশ করবে রে! এই নে তাের আগুন নে—আমার বাড়ি থেকে শিগগির বেরাে।” এই বলে সে ওয়াসিলিসাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল, আর একটি মড়ার খুলি তাকে ছুড়ে দিল।

ওয়াসিলিসা একটা লাঠির আগায় খুলিটাকে চড়িয়ে বাড়ি নিয়ে গেল। কিন্তু বাড়িতে নিলে কি হবে? তার যে সেই সৎমা আর তার দুটো দুষ্ট মেয়ে, তাদের তাে কেউ কোনদিন আশীর্বাদ করে নি—তারা মহা খুশি হয়ে যেই আগনটা নিতে গিয়েছে অমনি তাদের গায়ে আগুন ধরে গিয়ে তারা তাে মরলই, বাড়িঘর সব পুড়ে ছাই হয়ে গেল।

ওয়াসিলিসা আবার বসে কাঁদতে লাগল। তখন তার কাঠের পুতুলের কথা মনে হল। পুতুলের মুখে খাবার দিয়ে বলল, “কাঠের পুতুল, খাবার খাও, আবার তুমি জ্যান্ত হও, আমার সঙ্গে কথা কও।” কাঠের পুতুল জেগে উঠে বলল, “কাঠের পুতুল সঙ্গে রয়, ওয়াসিলিসার কিসের ভয়? তুমি রাজার কাছে যাও তিনি তােমায় সখী করবেন।”

ওয়াসিলিসা তখন রাজার বাড়ি চলল। এমন সুন্দর মেয়ে, এমন মিষ্টি কথা বলে, কেউ তাকে বারণ করল না, কেউ বাধা দিল না। ওয়াসিলিসা একেবারে রাজসভায় রাজার সামনে গিয়ে উপস্থিত।

রাজা এমন চমৎকার মেয়ে কখনাে কোথাও দেখেন নি তিনি তার কথা শুনবেন কি—তাড়াতাড়ি সিংহাসন থেকে উঠে পড়লেন, বললেন, “আহা কি সুন্দর মেয়েটি গাে! তুমি কার মেয়ে ? কি তােমার দুঃখ? তুমি আমায় বিয়ে কর—আমার রাজ্যের রানী হয়ে থাক—আমি তােমার সব দুঃখ দূর করব।”

এমনি করে ওয়াসিলিসা রানী হলেন—আর সেই কাঠের পুতুল সােনার খাটে, মখমলের গদিতে, রেশমের চাদরের ওপর ঝকঝকে পােশাক পরে শুয়ে থাকত।

পাজি পিটার